ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই উধাও নবীনরা, ধরনা মঞ্চে মমতার সঙ্গী মাত্র 8 বিধায়ক
eTV Bharat | ০২ জুন ২০২৬
কলকাতা, 2 জুন: দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনকালের অবসানের পর রাজ্যে ফের বিরোধী আসনে তৃণমূল কংগ্রেস। ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার এক মাসের মাথাতেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে চরম ডামাডোল এবং ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে ফের একবার প্রতিবাদী মেজাজে দেখা গেল তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই রাজপথের লড়াইতে তাঁর পাশে দেখা মিলল না কর্পোরেট ধাঁচে গড়ে ওঠা নবীন প্রজন্মের নেতাদের। বরং ভ্যাপসা গরমে নেত্রীর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল সেই পুরনো দিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিকদেরই।
ক্ষমতার সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরেই ঘাসফুল শিবিরের ভিতরের ফাটল একেবারে বেআব্রু হয়ে পড়েছে। সুব্রত মুখার্জি, সোমেন মিত্রদের মতো নেতারা আজ নেই। মুকুল রায়ের মতো একসময়ের চাণক্যও আজ আর ময়দানে নেই। যে লড়াইয়ের পথ পেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, আজ সেই দলই যেন দিশেহারা। বিরোধী দলনেত্রীর পদ থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর আসন— এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়েছেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরেই দলের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র বিদ্রোহ। আজ এই নেতা তো কাল ওই সাংসদ, প্রতিদিন কেউ না কেউ প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। বিধানসভায় দলের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ইতিমধ্যেই বহিষ্কৃত হয়েছেন 80 জন বিধায়কের মধ্যে 2 জন। বাকি 78 জনের অনেকেও নাকি পরিস্থিতি বুঝে পা ফেলার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বিক্ষুব্ধ এই নেতা-নেত্রীদের বড় অংশের নিশানায় রয়েছেন দলের শীর্ষ যুব নেতৃত্ব এবং কর্পোরেট সংস্কৃতি। দলের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে আইপ্যাক ও ক্যামাক স্ট্রিটের সংস্কৃতির জেরে নিচুতলার কর্মী থেকে শুরু করে পুরনো নেতাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। দলের সুপ্রিমোকেও নাকি ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষো চলছে। নির্বাচনের আগে যে হাইভোল্টেজ প্রচার, ঝাঁ-চকচকে ইভেন্ট এবং কর্পোরেট কালচার দেখা গিয়েছিল, ক্ষমতা হারানোর পর তা যেন উধাও। ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে আসা সাধারণ কর্মীদের আক্ষেপ, একসময় তাঁদের মানুষের মতো সম্মানটুকুও দেওয়া হত না। আর আজ সেই 'গ্ল্যামারাস' নেতারা বা বুদ্ধিজীবীরা সংকটের দিনে পুরোপুরি গায়েব।
ঠিক পনেরো বছর পর বাংলা ফের একবার দেখল বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পথে নামতে। ধর্মতলার ওয়াই-চ্যানেলে মাত্র কয়েকশো কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে স্পষ্ট হয়ে গেল, ক্ষমতা ছাড়া তৃণমূল নেত্রীর আসল সঙ্গী কারা। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মালা রায়, দোলা সেন, ডেরেক ও'ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা। বিধায়কদের মধ্যে হাজির ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন— মদন মিত্র, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, অশোক দেব, কুণাল ঘোষ, অসীমা পাত্র, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো পুরনো মুখেরা। অর্থাৎ, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হননি, তখন থেকে যাঁরা মিটিং-মিছিলে তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন, আজ এই দুঃসময়ে তাঁরাই এসি ঘরের আরাম ছেড়ে ভ্যাপসা গরমে রাজপথে বসে রয়েছেন।
অথচ, একটা সময় দলে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল। বয়সের কারণ দেখিয়ে প্রবীণদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রবীণ নেতা নেত্রীর জন্য নিজের জেতা আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ যখন দল গভীর সংকটে, তখন সেই সায়নী ঘোষ, লাভলি মৈত্র, জুন মালিয়াদের দেখা মিলছে না। কোথায় গেলেন দেবাংশু বা তৃণাঙ্কুরের মতো যুব নেতারা, যাঁরা অল্প বয়সেই দলের বড় দায়িত্ব পেয়েছিলেন? রাজনৈতিক মহলের মতে, এই কঠিন সময়ে তাঁদেরই তো পথে নেমে সংগঠনকে চাঙ্গা করার কথা ছিল।
রাজনীতিতে আবেগ নেই বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি যেন অন্য কথা বলছে। কথায় বলে "ওল্ড ইজ গোল্ড"। গত কয়েক বছরের তৃণমূল কংগ্রেসে নতুন পুরনো দ্বন্দ্ব নিয়ে কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু আজ যখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই। সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে দূরে, আন্দোলন লড়াই প্রতিবাদ প্রতিরোধের সময়, তখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসা সেই পুরনোরাই। যত সময় যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস বুঝছে নতুনের নামে যাদের ভরণপোষণ করেছে, যাদের নিয়ে ঘাসফুলের বাগান করেছেন মমতা। তারা শুধু সংখ্যা মাত্র।