কলকাতা, 2 জুন: ধর্মতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের ধরনা মঞ্চে অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী থাকল রাজ্য রাজনীতি৷ মঙ্গলবার অতিরিক্ত গরম ও লাগাতার রাজনৈতিক কর্মসূচির ধকলের জেরে ওয়াই চ্যানেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধরনা মঞ্চে আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে দেখে মঞ্চেই তাঁকে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতে দেখা যায় স্বয়ং তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে একটি অ্যাম্বুল্যান্স আনা হলেও তাতে উঠতে রাজি হননি কুণাল। কিছুক্ষণ মঞ্চে বিশ্রামের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তিনি নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলেই তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে।
সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের পর ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। বিরোধী আসনে বসে দলের উপর নেমে আসা চাপ ও ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রতিবাদে এদিন ধর্মতলায় পথে নেমেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সেই কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে ওয়াই চ্যানেলের ধরনা মঞ্চে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন কুণাল ঘোষ। কিন্তু বক্তব্য শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি প্রবল গরমে দুর্বল বোধ করতে শুরু করেন।
অত্যধিক রোদের তাপ এবং অস্বস্তিকর আর্দ্রতার জেরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মঞ্চের উপরে বসে পড়েন এই তৃণমূল বিধায়ক। তাঁর এই আকস্মিক অসুস্থতায় উপস্থিত দলীয় নেতা ও কর্মীদের মধ্যে রীতিমতো হইচই ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির সামাল দিতে তৃণমূল সুপ্রিমো নিজেই এগিয়ে আসেন। অসুস্থ সতীর্থকে স্বস্তি দিতে তিনি নিজের হাতে পাখা তুলে নিয়ে হাওয়া করতে থাকেন। তৃণমূলের একটি সূত্রের খবর, দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্লান্তি এবং রোদেই সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
ধরনা মঞ্চে যাওয়ার আগে এদিন বিধানসভার অন্দরেও এক বেনজির সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৃণমূলের এই নেতা। মঙ্গলবার দুপুরে দলীয় সতীর্থ অসীমা পাত্রকে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভায় গিয়েছিলেন কুণাল। তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি জমা দেওয়া। কিন্তু স্পিকারের অনুপস্থিতিতে তাঁর সচিবালয় ওই চিঠি গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকার করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিধানসভা চত্বরে ব্যাপক শোরগোল তৈরি হয়।
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, গত সোমবারও তাঁরা একটি চিঠি জমা দিয়েছিলেন যা স্পিকারের দফতর গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এরপরই নাকি স্পিকারের তরফ থেকে কড়া নির্দেশিকা জারি করা হয় যে বিরোধী দলের কাছ থেকে নতুন করে আর কোনও চিঠি নেওয়া যাবে না। সেই নির্দেশের দোহাই দিয়েই এদিন তৃণমূলের প্রতিনিধি দলকে ফেরায় সচিবালয়।
চিঠি গ্রহণ না করার প্রতিবাদে বিধানসভার অন্দরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন কুণাল ঘোষ। স্পিকারের দফতরে চিঠি জমা দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এক অভিনব পন্থার আশ্রয় নেন তিনি। জোরপূর্বক স্পিকারের সচিবের টেবিলে একটি পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে নিজেদের চিঠিটি রেখে আসেন কুণাল ও অসীমা। গোটা ঘটনাটি যাতে ভবিষ্যতে কোনও আইনি জটিলতা তৈরি করতে না পারে, তার জন্য মোবাইল ক্যামেরায় সেই মুহূর্তের ভিডিয়ো রেকর্ড করে নেন তাঁরা।
বিধানসভার বাইরে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্পিকার ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দেন কুণাল। তিনি তীব্র ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, স্পিকার ব্যস্ত থাকলে বা দেখা না করলে কি বিরোধী দল কোনও চিঠিও জমা দিতে পারবে না? তাঁর অভিযোগ, সরকার এমন কিছু করতে চাইছে যার বিরোধিতার কোনও লিখিত রেকর্ড তারা রাখতে রাজি নয়। সেই কারণেই সুপরিকল্পিতভাবে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।
তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রবীণ তৃণমূল নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েই ওই চিঠিটি স্পিকারকে দিতে গিয়েছিলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। স্পিকারের দফতর চিঠিটি গ্রহণ না করায় পরবর্তী সময়ে ওই একই চিঠি ইমেল করে স্পিকারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একদিকে বিধানসভার অন্দরে বিরোধী দলের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এই নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক সংঘাত, আর অন্যদিকে চরম গরমে রাস্তায় নেমে ধরনা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ — এই জোড়া চাপের কারণেই শেষ পর্যন্ত কুণাল ঘোষ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে এই চরম ব্যস্ততা এবং উত্তেজনার মধ্যেও তৃণমূল নেত্রী যেভাবে অসুস্থ বিধায়কের পাশে দাঁড়িয়ে মাতৃসুলভ আচরণ করেছেন, তা রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় এক অন্যরকম নজির তৈরি করল।