এই সময়: বিধায়কদের ‘সই–বিকৃতি’ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই সরগরম রাজ্য রাজনীতি। বিধানসভার স্পিকারকে দেওয়া তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষর সম্বলিত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি ঘিরে ইতিমধ্যেই সিআইডি তদন্ত শুরু হয়েছে। এমনকী, বেশ কয়েক জন তৃণমূল বিধায়কের হস্তাক্ষর পরীক্ষা করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। এরই মধ্যে মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি নিয়ে নতুন জল্পনা তৈরি হয়। তার কারণ, রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়ের ফেসবুক পেজ থেকে করা একটি পোস্ট। সেখানে দাবি করা হয়–– ‘তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার।’
যদিও পরে তাপস বলেন,‘আমার ফেসবুক পোস্ট করেন অন্য কেউ।’ যাঁকে ঘিরে জল্পনা, সেই ঋতব্রত সংবাদমাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা করেন বলে জানালেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ফের তোপ দাগেন। তবে তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়কের এ দিনের দাবিতে ইঙ্গিত–– বিদ্রোহী ব্লক ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। সংখ্যা কতটা বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে রাজ্য বিধানসভায় ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ দেখতে পাওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
এ দিন অবশ্য ‘বিদ্রোহী–ব্লকের’ তরফে কথাবার্তা চালানো হলেও স্পিকার না-থাকায় সরকারি ভাবে কোনও চিঠি জমা দেওয়ার কথা সামনে আসেনি। তবে সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে স্পিকারের কাছে নতুন একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার বিধায়ক অসীমা পাত্র ও কুণাল ঘোষ এই দ্বিতীয় চিঠি বিধানসভায় জমা দিতে গেলে তা অফিশিয়ালি গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কুণালের কথায়, ‘সোমবার আমরা একটি চিঠি দিয়েছিলাম। বিধানসভার অফিসে তা জমা পড়েছিল। এ দিন চিঠি দিতে গেলে সেটা সচিবের অফিস নেয়নি। আমরা ই–মেলে ওই চিঠি পাঠিয়েছি। আইনমাফিক চিঠির হার্ড কপি পাঠানো হবে। সচিবের টেবিলেও চিঠি রেখে এসেছি। ওই চিঠির বিষয়বস্তু পরে বলব।’
চিঠি এবং সই-বিতর্কের মধ্যেই মঙ্গলবার এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।বিধানসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো চিঠিতে থাকা দলীয় বিধায়কদের সই জাল কি না, ফরেন্সিক পরীক্ষাতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে মমতা মনে করছেন।
ইতিমধ্যেই তৃণমূলের দুই বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচন করার জন্য তৃণমূল কোনও রেজ়োলিউশন গ্রহণ করেনি। এমনকী, অভিষেকের চিঠির সঙ্গে বিধায়কদের সই সম্বলিত যে নথি পাঠানো হয়েছে সেখানেও অনেকে স্বাক্ষর করেননি। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই সিআইডি বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার নবান্ন-তে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সই জালিয়াতিতে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে মমতা বলেন, ‘হ্যান্ড রাইটিং সংশ্লিষ্ট বিধায়কের কি না, তা জানতে ফরেন্সিক টেস্ট করান। সই কেউ বড় অক্ষরে, কেউ ছোট অক্ষরে করেন। ৭৭ জন বিধায়ক প্রথম দিনের (কালীঘাটে অনুষ্ঠিত) বৈঠকে ছিলেন। সেখানে সর্বসম্মত ভাবে তাঁরা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর ভিডিয়ো রেকর্ডিং আছে।’
ফরেন্সিক টেস্টের পক্ষে মমতা সওয়াল করলেও গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, ‘তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক সিআইডি-র কাছে কবুল করেছেন যে, তাঁরা কোনও স্বাক্ষর করেননি। অন্য কেউ তাঁদের নাম ক্যাপিটাল লেটারে লিখে দিয়েছেন। কোনও রেজ়োলিউশন গ্রহণ করা হয়নি।’
সই-বিতর্কে তৃণমূলের অন্দরে কাজিয়ার মধ্যেই ঋতব্রত এ দিন জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ, বুধবার হাওড়ায় যে প্রশাসনিক বৈঠক করবেন, সেখানে জেলার অধিকাংশ তৃণমূল বিধায়ক উপস্থিত থাকবেন। ঋতব্রতর কথায়, ‘আমি এটা বলতে পারি, হাওড়া জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল বিধায়ক মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যাবেন।’ ঋতব্রতর এই মন্তব্য ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করছেন তৃণমূলের অনেকে।
মমতা নিজে বিধানসভায় অভিষেকের পাঠানো চিঠির বৈধতার পক্ষে সওয়াল করলেও রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায় বলেন, ‘বিধায়কের সই জাল হচ্ছে, এটা ভারতে কোথাও হয়েছে বলে শুনিনি। তৃণমূলের বিধায়করাই তো বলেছেন, সই তাঁদের নয়। এই জালিয়াতি কোনও বিধায়ক করেছেন বলে প্রমাণিত হলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হবে। অন্য কেউ করলেও তাঁর শাস্তি হবে।’
মঙ্গলবার কুণাল ও অসীমা যে চিঠি বিধানসভায় জমা দিয়েছেন, তার বিষয়বস্তু খোলসা না-করা হলেও অভিষেক সোমবার যে চিঠি দিয়েছেন, সেখানে ২০০১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত যাঁরা বিরোধী দলনেতা হয়েছেন, তাঁদের নাম সংশ্লিষ্ট দলের তরফেই পাঠানো হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে শুভেন্দু অধিকারীর নাম সুপারিশ করার ফলেই তিনি বিরোধী দলনেতা হন বলে ওই চিঠিতে জানানো হয়েছে। ২০০১ সালে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় একই ভাবে বিরোধী দলনেতা হন বলেও উল্লেখ রয়েছে। ওই ঘটনাক্রমের উদাহরণ দিয়ে শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা ও ফিরহাদ হাকিমকে বিরোধী সচেতক হিসেবে ঘোষণা করার আর্জি জানিয়েছেন অভিষেক।
এ দিন ওয়াই চ্যানেলের ধর্নাতে মমতা বলেন, ‘২০০৬–তে আমরা ২৯টি সিট পেয়েছিলাম। বিরোধী দল হওয়ার জন্য ৩০টি দরকার ছিল। সিপিএম তখন বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেয়নি। আমাদের ৩০ জন বিধায়ক যখন হলো, তখন বিরোধী দলনেতার পদ দিয়েছিল।’ তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিধানসভায় পর পর চিঠি জমা পড়ায় তাপস রায় এ দিন বলেন, ‘তৃণমূল আর কত চিঠি দেবে? শোভনদেব দিয়েছিলেন। এ দিন কুণাল দিলেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তার আগে চিঠি দিল। চিঠির লড়াই চলছে। আসলে তৃণমূল ভাঙছে, এতে আমি খুশি।’
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত মঙ্গলবার দীর্ঘ সময় বিধানসভায় ছিলেন। যদিও সেখানে তিনি ‘ব্যক্তিগত কাজ’ করেছেন বলে জানিয়েছেন উলুবেড়িয়া-পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক। তৃণমূল বিধায়কদের একটা বড় অংশ কি অন্য কাউকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে দাবি জানিয়ে চিঠি দেবেন? ঋতব্রতর উত্তর, ‘এ বিষয়ে কোনও তথ্য আমার কাছে নেই। তবে আগামিকাল কী হবে, তা এখনই বলতে পারছি না। সন্দীপন ও আমার দায়িত্ব আজ নিতে পারি। অন্য কারও দায়িত্ব নিতে পারব না।’ তবে ঋতব্রত এটা স্বীকার করেছেন যে, তিনি মধ্যমগ্রামের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী রথীন ঘোষের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তৃণমূলের অন্য বিধায়কদের নিয়ে কোনও বৈঠক হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। রথীন অবশ্য বলেন, ‘মিথ্যা বলা হচ্ছে। ওই বৈঠক নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না।’ মমতা এ দিন ধর্নায় বলেন, ‘পুলিশ গিয়ে বিধায়ককে বলছে, আপনাকে তৃণমূল ছাড়তে হবে। নতুন তৃণমূল বানাতে হবে। যাঁরা রক্ত দিয়েছে, লড়াই আন্দোলন করে এসেছে, তাঁরাই আমার কাছে আসল তৃণমূল।’