শিলাদিত্য সাহা
প্রেমিকের খোঁজে ঝাড়খণ্ড আর বাংলার জঙ্গলমহল চষে ফেলেছিল সে। সময়টা ছিল ২০২৪-এর নভেম্বরের ডিসেম্বর। তবু সঙ্গী জোটেনি কপালে। ঘুমপাড়ানি গুলি খেয়ে ২০২৫-এর ১ জানুয়ারি বন দপ্তরের খাঁচায় নিস্তেজ হয়ে ফিরতে হয়েছিল ওডিশার সিমলিপালে। দেড় বছর পরে সেই সাড়া-জাগানো বাঘিনি জ়িনাত মা হলো প্রথম বারের জন্য। সদ্য প্রকাশিত ক্যামেরা ট্যাপের ছবিতে সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভের বনাধিকারিকরা দেখেছেন, মুখে করে সদ্যোজাত সন্তানদের নিয়ে জঙ্গলের গভীরে হাঁটছে জিনাত। খুশির হাওয়া ওডিশা বন দপ্তরে।
সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর প্রশান্তচন্দ্র গোগিনেনি মঙ্গলবার ফোনে বলেন, 'আমরা জিনাতকে কোনও ভাবে এখন বিরক্ত করতে চাইছি না। চারটি শাবক হয়েছে, ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবি দেখে মনে হচ্ছে ওদের বয়স ৩-৪ সপ্তাহের বেশি হবে না। এখনও সম্ভবত চোখও ফোটেনি। আমাদের কাছে জিনাতের প্রাইভেসি আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।' ওডিশার শীর্ষ বনাধিকারিক এর পাশাপাশিই মানছেন, আর পাঁচটা বাঘিনির শাবক হওয়ার থেকে জিনাতের মা হওয়ার গুরুত্ব অনেকটাই বেশি।
কেন ওডিশার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ জিনাত? সে তো সিমলিপালের জঙ্গলে না-থেকে নিজেই ঝাড়খণ্ড হয়ে বাংলার জঙ্গলমহলের তিন জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল! ২০২৪-এর ডিসেম্বরে তাকে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করার পরেও ওডিশা ফেরত পাঠানো নিয়ে টালবাহানা করেছিলেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শীর্ষ স্তরের প্রশাসকরা। এমনকী, জিনাতকে বাংলায় রেখে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। যদিও শেষমেষ বাঘিনিকে ধরার পরে সিমলিপালেই ফেরত পাঠানো হয়।
আসলে জিনাতের শাবক প্রসবের ঘটনা সিমলিপালের উত্তর প্রজন্মের জন্য বিরাট সাফল্যের সঙ্কেত। সিমলিপালের জঙ্গলে বাঘের সংখ্যা গত এক দশকে ক্রমশ যখন কমছিল, তখন বংশবৃদ্ধির জন্য এবং জিনগত বৈচিত্র্য তৈরির জন্য জিনাতকে সেখানে আনা হয়েছিল মহারাষ্ট্রের তাডোবা-আন্ধেরি টাইগার রিজার্ভথেকে। তখন তার বয়স মাত্র দু'বছর। পরে জিনাতের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল 'ইরিডিয়াম আপলিঙ্ক বেসড স্যাটেলাইট রেডিয়ো কলার'। তাই সিমলিপাল থেকে বেরিয়ে ঝাড়খণ্ড আর বাংলায় গেলেও সে কখনও সেই অর্থে নজরের আড়ালে ছিল না। কিন্তু একবারও পুরুষ সঙ্গী জোটেনি তার। সিমলিপাল ফেরার পরেও জিনাতের সঙ্গী জুটছিল না সে ভাবে।
শেষ পর্যন্ত জিনাতের মা হওয়ার মানে, সিমলিপালেই জন্ম নেওয়া কোনও বাঘের সঙ্গে তার মিলন হয়েছে। ফলে জন্মসূত্রে তাডোবার জিনাতের জিনগত বৈচিত্র্যের সঙ্গে সিমলিপালের বাঘের জিনগত বৈশিষ্ট্য মিশেই জন্ম নিয়েছে চারটি শাবক। প্রেমিকের খোঁজে জিনাতের জার্নির সঙ্গে পরিচিত বাংলা। এ বার মা জিনাতের স্নেহের পরশে ভবিষ্যতের সোনালি রেখা খুঁজছে ওডিশা।