দেবাশিস পোদ্দার
‘ঘাড়ে যদি পড়ি বাপু, প্রাণ হবে অন্ত, পথ–মাঝে র’বে পড়ে ছিরকুটে দন্ত।’
‘সাইকেলে বিপদ’ দেখে সেই কবে কথাগুলো লিখেছিলেন কবি সুনির্মল বসু। ছোটবেলা থেকে আমরাও প্রায় সবাই শুনেছি— ‘সাইকেল শিখতে গেলে দু’এক বার পড়তেই হবে’। এটাই যেন ধ্রুব সত্য।
কিন্তু যুগের সঙ্গে কত কিছু যখন বদলে গিয়েছে, তখন সাইকেল শেখার পদ্ধতি কেন এক জায়গায় থমকে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শিশুদের সাইকেল শেখানোর এক অভিনব ‘সহজ পাঠ’ খুঁজে পেয়েছেন দমদম ক্যান্টনমেন্টের বাসিন্দা আইটি কর্মী শমীক দত্ত। ইতিমধ্যে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর কেড়েছে অনেকেরই।
১১ এপ্রিল থেকে ৩০ মে পর্যন্ত শমীকের ন’টি শনিবাসরীয় ফ্রি সাইকেল লার্নিং ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছে প্রায় ৮২ জন খুদে। শমীক জানিয়েছেন, এদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি ইতিমধ্যেই সাইকেল চালানো শিখে ফেলেছে। আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় শমীকের ‘সাইকেলের সহজ পাঠ’–এর ভিডিয়ো দেখে পূর্বা পাল, প্রিয়াঙ্কা পাল, জুঁই মুখোপাধ্যায়ের মতো অনেকের সন্তানরাই মাত্র কয়েক দিনে, এমনকী যাদবপুরের এক আট বছরের শিশু মাত্র ৪৫ মিনিটে সাইকেল চালানো শিখে ফেলেছে।
ইতিমধ্যে তাঁকে দারুণ খুশি করেছে গত ২৫ মে–র একটি ফোন। সে দিন এক অটিস্টিক শিশুর বাবা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফোন করেন শমীককে। গত দু’বছর ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি তাঁর আট বছরের মেয়েকে সাইকেল চালানো শেখাতে পারেননি। কিন্তু ফেসবুকে শমীকের ভিডিয়ো দেখে সাইকেলের প্যাডেল খুলে চেষ্টা করতেই ঘটে ম্যাজিক— মাত্র তিন দিনে নিজে নিজেই সাইকেল চালানো শিখে যায় সেই কিশোরী।
আদতে এই পথচলা শুরু বছর চারেক আগে। শমীক তাঁর মেয়ে হৃদিশার জন্য সাইকেল কিনেছিলেন। কিন্তু ব্যালেন্সিং হুইল খুললেই মেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। পরে কর্মসূত্রে ইউরোপে গিয়ে তিনি দেখেন, দেড়–দু’বছরের খুদেরা কোনও চেন বা প্যাডেল ছাড়া অনায়াসে ‘ব্যালেন্সিং বাইক’ চালাচ্ছে। ওখানে ওদের আগে ব্যালেন্স শেখানো হয়, প্যাডেল করা নয়। দেশে ফিরে এই টেকনিকে মেয়েকে সাইকেল চালানো শেখাতে সফল হন শমীক। টেকনিকের নাম দেন ‘ইন্দো–ইউরো স্টাইল’।
শমীক জানালেন, এই পদ্ধতিতে প্রথমে সাইকেলের প্যাডেল এবং ব্যালেন্সিং হুইল দুটো খুলে ফেলা হয়। এর পরে সাইকেলের সিটে বসে শিশুরা স্রেফ পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে এগোবে, যাকে বলে গ্লাইডিং। ব্যালেন্স এসে গেলে তখন প্যাডেল লাগিয়ে দেওয়া হয়। ব্যস! শিশুরা তখন নিজে থেকেই ম্যাজিকের মতো সাইকেল চালাতে শুরু করে।
শমীকের এই উদ্যোগে তাঁর মস্ত বড় ভরসা তাঁর আট বছরের মেয়ে হৃদিশা, যে ‘খুদে ট্রেনার’ হয়ে অন্য বাচ্চাদের সাহস ও ইনস্ট্রাকশন দেয়। শমীক বললেন, ‘সাইকেল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে ছোটরা মোবাইলের পর্দার বাইরে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে আবার সম্পর্ক তৈরি করুক। খুঁজে পাক নতুন বন্ধু।’ এর অন্য উপকারিতা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, সাইকেল চালানোর সময়ে ভারসাম্য রাখা, গতি ও দূরত্ব বিচার এবং ভয় নিয়ন্ত্রণ করার ফলে শিশুদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মনোযোগ ও ফোকাস বাড়ে।
শমীকের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ‘কলকাতা সাইকেল সমাজ’–এর শতঞ্জীব গুপ্ত বলেন, ‘ইউরোপে থাকার সময়ে সাইকেল–বান্ধব শহরগুলো ঘুরে দেখেছেন শমীক। দেশে ফিরে যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। কম দূরত্বে সাইকেল চালানোর ব্যাপারে বাচ্চারা বইয়ে পড়েছে, সেটাই শমীকের চেষ্টায় এখন বাস্তবে হচ্ছে।’
আজ, বুধবার, ‘বিশ্ব বাইসাইকেল দিবসে’ এই খুদেদের নিয়েই একটি বিশেষ গ্রুপ রাইডের আয়োজন করেছেন শমীক। তাঁর হাত ধরে চাকা ঘুরছে, ডানা মেলছে এক সবুজ ভবিষ্যৎ।