১৫ বছরের শাসনকাল। মাত্র দু’বছর আগের লোকসভা ভোটেও বিপুল জনসমর্থন পেয়েছিল তৃণমূল। তবে সদ্যসমাপ্ত বিধানসভায় কার্যত পায়ের তলার মাটি ধসে গিয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলের। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানতে না চাইলেও তাঁর সতীর্থদের অনেকেই বলছেন, এমনটা তো হওয়ারই ছিল। কিন্তু কেন? তৃণমূলের সাংসদদের ময়নাতদন্তে উঠে আসছে অসংখ্য কারণ। কী বলছেন তাঁরা? খোঁজ নিল এই সময়।
রাজ্যে পালাবদলের পরে পেরিয়েছে প্রায় এক মাস। কেন এমন বিপর্যয় ঘটল তৃণমূলের, তার কোনও ময়নাতদন্ত সে ভাবে করেনি দল। তবে দলের সাংসদ-বিধায়ক থেকে কাউন্সিলার, মায় পাড়ার নেতারা পর্যন্ত বুঝতে পারছেন, এমনটা নাকি ঘটারই ছিল। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় মনে করেন, এই বিপর্যয়টা ঘটারই ছিল। কিন্তু কেন?
সুখেন্দুশেখর বলছেন, ‘দলের অনেকেই বুঝেছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব বুঝতে পারেনি যে, এ রকম একটা ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে দল এগিয়ে চলেছে। এটা ওঁরা বুঝতে পারেননি অথবা বুঝতে চাননি। দলকে সংশোধন করতে যা যা করার দরকার, সেটা করা উচিত ছিল নেতৃত্বর। যে কোনও দলই তাই করে। বিভিন্ন দল বিভিন্ন সময়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তবে যখন বুঝতে পারে যে মানুষ সিগন্যাল দিচ্ছে, অনাস্থা প্রকাশ করছে, সেই সময়ে যে কোনও রাজনৈতিক দলকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হয়, যাতে মানুষ তাদের কাছ থেকে সরে না যায়।’
প্রবীণ এই সাংসদের মতে, জনতার কোনও প্ল্যাটফর্ম নেই, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা অনাস্থা প্রকাশ করবে। বিরোধী দলের মাধ্যমে কিছু মানুষ তাঁদের অনাস্থাটা প্রকাশ করেন। বিরোধী দল থাকাটা খুবই জরুরি। সরকারের যে কাজগুলো সঠিক হচ্ছে না, তার সমালোচনা করে বিরোধীরা। যাতে সরকার বুঝতে পারে, যদি কিছু নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা হয়, মানুষের সমর্থন চলে যেতে পারে।
তৃণমূলের বিপর্যয়ের আভাস অনেক আগে থেকেই পেয়েছিলেন—সাফ জানালেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর মতো তৃণমূলের অনেকেই এখন এই বিষয়গুলি প্রকাশ্যে বলছেন। তার পরে দলের নেতাদের একাংশের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। দলের মধ্যে না বলে কেন বাইরে বলা হচ্ছে? কেন আগে তাঁরা নেতৃত্বকে বিষয়গুলি জানাননি?
সুখেন্দুর জবাব, ‘দলের মধ্যে কোথায় বলবেন? কালীঘাটে যেতে হলে, বিশাল ঘেরাটোপের মধ্যে দিয়ে যেতে হতো। আর যাবই বা কেন? যদি মিটিং ডাকে, তবেই তো যাব। আমি যে দিন থেকে তৃণমূল জয়েন করেছি, সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত কোথাও কারও মতামত জানতে চাওয়া হয়নি। যাঁরা এই মিটিংগুলোয় হাজির থেকেছেন, আশা করি, স্বীকার না করলেও মনে মনে বলবেন, আমি ঠিকই বলছি।’
ভোটের ফলাফলের ময়নাতদন্তের কথা বলছেন অনেকেই। সেটাই বা কেন হচ্ছে না?
এ প্রসঙ্গে সুখেন্দুশেখরের জবাব, ‘এই বিপর্যয়টা কেন হলো সেটা নিয়ে আলোচনার দরকার ছিল। ভোটের ফলের পরে এমপিদের ডাকা হয়েছে, বিধায়কদের ডাকা হয়েছে, কাউন্সিলার, এমনকী পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়েছে। কিন্তু আলোচনাটা হলো কী! সেই ওয়ান–ওয়ে ট্র্যাফিক। আগে কতগুলো নির্দেশ দেওয়া হতো। কেউ কিছু বলতে চান কি না, কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
দলের নেতাদের একাংশ বারবার বলছেন নেতৃত্বের বোঝা উচিত ছিল। কারা সেই নেতৃত্ব?
সুখেন্দু বলেন, ‘আমাদের তো একটা স্ট্রাকচার আছে। আমরা জাতীয় দল না হলেও আমাদের জাতীয় পর্যায়ের কমিটি আছে। লোকজন আছে। সাংগঠনিক কাঠামো তো আছেই। লক্ষ লক্ষ ডেডিকেটেড ওয়ার্কার এখনও আছেন। কিন্তু তাঁদের কথা শোনার কেউ নেই। যাঁরা বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন, তাঁদের কথাই বলছি।’
ভোটের ফলপ্রকাশ হওয়া ইস্তক তৃণমূলের নেতাদের বড় অংশ কাঠগড়ায় তুলেছেন দল-নিযুক্ত ভোটকুশলী সংস্থাকে। অভিযোগ করছেন, কর্পোরেট স্ট্রাকচারে নিয়ে যাওয়ার জন্যই দলের এই অবস্থা।
এ নিয়ে সহমত সুখেন্দুশেখরও। তিনি বলেন, ‘কোথাকার একটা ভুঁইফোড় সংস্থাকে আনা হলো। তারা নাকি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এত দক্ষ যে, আমাদের সোশ্যাল, ইকোনমিক কন্ডিশন, জনবিন্যাস, মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা—সব কিছু ওরা নাকি সুন্দর ভাবে বুঝতে পারবে। তারা নাকি এ সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে আমাদের গাইড করবে। তাতেই নাকি দল জিতে যাবে। তবে শেষে দেখা গেল ওটা একটা দালাল সংস্থা!’
অনেকেই স্বীকার করেন যে, তৃণমূলের আমলে চালু করা সামাজিক প্রকল্পগুলি নিঃসন্দেহে ভালো ছিল। তা হলে ভুলটা কোথায় হলো?
সুখেন্দুর জবাব, ‘কিছু স্কিম সত্যিই ভালো ছিল। মানুষ সেটা গ্রহণও করেছিল, আশীর্বাদও করেছিল। কিন্তু তুমি লাগামহীন ভাবে কিছু লোককে ছেড়ে দিলে, চুরি করার জন্য। কোনও কর্মীর কাছে রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। কারণ বিরোধী ছিল না। সিপিএম শূন্য, কংগ্রেস শূন্য। বিজেপি ৭৭টা এমএলএ পেল গত বিধানসভা নির্বাচনে। তুমি সেখান থেকেও এমএলএ ভাঙিয়ে আনলে টাকা দিয়ে, বা অন্য ভাবে প্রভাবিত করে, ভয় দেখিয়ে। তুমি যদি গণতন্ত্রে বিরোধী স্পেস না রাখো, তা হলে যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। শুধু তাই নয়, অভয়া আন্দোলনের সময়ে রাত দখল কর্মসূচিতে আমি নিজের মতো করে বিচার চেয়েছিলাম। এর জন্য আমায় লালবাজারে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। খুবই অপমানিত হয়েছিলাম সে জন্য।’
কোথাও কি মনে হয়, নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার জায়গা তৈরির চিন্তাভাবনা আরও আগে করা উচিত ছিল?
সুখেন্দুশেখর বলেন, ‘আমার তো মনে হয়, ওই ভোটকুশলী সংস্থাকে আনা হয়েছিল মূলত টাকার রোজগার করার জন্য। ৮০০ কোটি টাকা দিয়ে নাকি আনা হয়েছিল ওদের। এটা অবশ্য শোনা কথা। কোটি কোটি টাকার ভাড়াটে সেনা দিয়ে দল চলে নাকি? এত লক্ষ লক্ষ কর্মী আছে। তাদের দিয়ে দল চালানো যাচ্ছে না? ক্ষমতায় আসার আগে এরাই কিন্তু বুকের রক্ত মুখে তুলে সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।’
শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী। শপথ নেওয়ার পরে এক মাসও কাটেনি। তার মধ্যেই অন্নপূর্ণা যোজনা চালু, বিএসএফ-কে জমি দেওয়া, বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেওয়া, অনেকগুলো সিদ্ধান্ত। এটাকে কেমন ভাবে দেখছেন?
সুখেন্দুর জবাব, ‘গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার এবং সৌজন্য, সেটাই শাসকের প্রথম ক্রাইটেরিয়া। সেই গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার এবং সৌজন্য কিন্তু এই নতুন সরকার দেখাচ্ছে। এটা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।’ শিষ্টাচারের প্রসঙ্গে সুখেন্দুর সংযোজন, ‘ভোটের পরে গোলমাল নিয়ে শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার এবং শুভেন্দু অধিকারী—সকলেই বলেছেন যে এখানে বিরোধী বলে কারও উপরে কোনও অত্যাচার করা হবে না। এটা যাঁরা বলছেন, তাঁদের মধ্যে একজনের নামে ৫৬টা মিথ্যে মামলা ছিল আমাদের আমলে। তার পরেও তিনি এটা বলছেন।’
তৃণমূল দলটা কি তা হলে থাকবে না? রাজ্যসভার সাংসদের জবাব, ‘আমি জ্যোতিষী নই। কিন্তু এত বিপর্যয়ের পরেও যখন তাঁরা বিপর্যয়টাকে মানতে রাজি নন, তখন দলের যা হওয়ার তাই হবে।’
আপনি কি বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন? সাংসদের সাফ জবাব, ‘সংসদে আমার তিন বছর মেয়াদ বাকি। এই সময়ে দল ছাড়া, অন্য দলে যাওয়ার মতো কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে যে মানসিক পরিস্থিতি থাকা দরকার, এই মুহূর্তে সেটা আমার নেই। কিন্তু এটাও ঠিক যে, জীবন তো সতত পরিবর্তনশীল। রাজনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তো থাকেই!’