পকেটসই বাজেটে দিল্লির অভিজাত এলাকায় ঝাঁ চকচকে বেড-অ্যান্ড-ব্রেকফাস্ট (BnB) হোটেল। তাই রাজধানীতে চিকিৎসা থেকে কাজের প্রয়োজনে আসা বিদেশি অতিথিদেরও মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল এই হোটেল। অথচ প্রাথমিক তদন্তের পরে জানা গেল, আদতে ‘জতুগৃহ’ ছিল দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের এই হোটেল।
বুধবার সকালে ভয়াবহ আগুন লেগে যায় মালব্য নগরের ওই অভিজাত হোটেলে-রেস্তোরাঁয়। ঝলসে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২১ জনের। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন বহু বিদেশিও। প্রায় ৪০ জনকে উদ্ধার করে দিল্লির AIIMS-এ চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
প্রাথমিক তদন্তে দাবি, দিল্লির আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি BnB-তে অবৈধ ভাবে তৈরি হয়েছিল একাধিক ঘর। নিয়ম বিরুদ্ধ ভাবে সেখানে ছিল না কোনও ফায়ার এক্সিট। একটি মাত্র গেট দিয়েই ঢোকা-বেরোনো চলত। ফলে আগুন লাগার পরে বহু মানুষ বাইরে বোরোতে না পেরে ভিতরে আটকে পড়েন। সমস্যায় পড়েন উদ্ধারকারীরাও।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হোটেলের ভিতরে একাধিক ‘অবৈধ রুম’ তৈরি করা হয়েছিল। বিল্ডিংয়ের আসল নকশা না মেনে অতিরিক্ত ঘর বানানো হয়, যাতে বেশি সংখ্যক অতিথি রাখা যায়। এই অবৈধ ঘরগুলোর অনেকগুলিতে জানালা বা সঠিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল না। হোটেলটিতে মাত্র ছ’টা ঘর বানানোর লাইসেন্স ছিল কিন্তু সেই লাইসেন্সেই ১৯টি অতিরিক্ত ঘর তৈরি করা হয়েছিল অভিযোগ। অথচ BnB-এর নিয়ম অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আটটি রুম ও ১৬টি বেড রাখা যায়।
এই হোটেলের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, এখানে অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত নিয়ম সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল। কোথাও কার্যকর ফায়ার অ্যালার্ম ছিল না, আবার আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থাই ছিল না বা কাজ করছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভিতরে থাকা মানুষদের বেরোনোর সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
এ ছাড়াও, সরু করিডর, জটিল লে-আউট এবং অতিরিক্ত ঘর নির্মাণের কারণে বিল্ডিংয়ের ভিতরে চলাফেরা কঠিন হয়ে পড়ে। দমকলকর্মীদের উদ্ধারকাজেও এর ফলে ব্যাপক সমস্যা হয়। ঘরের অবস্থান খুঁজে পেতেই সময় লেগে যায়।
প্রশাসনের প্রাথমিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই BnB হোটেলটি প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে—কী ভাবে একের পর এক নিয়ম ভেঙে চলছিল এই হোটেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দিল্লির সরকারি সূত্রে খবর, হোটেলটি ফ্লোরিস স্টে নামে নথিভুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের বহু ছোট হোটেল ও গেস্টহাউস একই ভাবে নিয়ম ভেঙে ব্যবসা করে চলেছে। এই ঘটনা সেই বড় সমস্যাকেই সামনে এনে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই দিল্লি প্রশাসন শহরের অন্যান্য BnB ও ছোট হোটেলগুলিতে ব্যাপক তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল—নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক লাভের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।