• দোকানে রাখা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ছবিই এখন যেন বিড়ম্বনার কারণ
    এই সময় | ০৩ জুন ২০২৬
  • সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার

    প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক বৈঠক করতে উত্তরবঙ্গে যখনই এসেছেন, পাহাড়-ডুয়ার্স-চা বাগানে গিয়ে কোনও না কোনও দোকানে ঢুকে নিজেই তৈরি করেছেন চা, মোমো বা তেলেভাজা। সেই স্মৃতি একটা সময় পর্যন্ত উজ্জ্বল ছিল দোকান মালিকের কাছে। মুখ্যমন্ত্রীর দৌলতে রাতারাতি সেলিব্রিটিও হয়ে যান কেউ কেউ। কিন্তু ৪ মে-র পরে পরিস্থিতি বদলেছে। বলা ভালো, সেই সিনারিও নেই। একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন প্রাক্তন। সোনালি দিনের চকচকে সেই ছবি এখন দোকান থেকে নামিয়ে ফেলতে বলছেন খদ্দেররা। এমনকী মুখ্যমন্ত্রীর যে আশ্বাসে একদিন আশার আলো দেখেছিলেন টিলাবাড়ি আদিবাসী যুবক, তাঁর পরিবারও দোকানে লাগানো মমতার সেই ছবি সরাতে চাপ দিচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী মাঝেমধ্যেই খোটা দিয়ে বলছেন, 'হলো তো! দোতলা ঘরের খুব স্বপ্ন দেখেছিলে, এখন ভাঙাঘরেই থাকো।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক জানিয়েছেন, 'মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবি এখনও দোকানে রয়েছে, কিন্তু ঘরে বাইরের চাপে কতদিন আর রাখতে পারব বুঝতে পারছি না।'

    চালসা পাহাড়ের উপরে মেটেলি যাওয়ার পথে মোমোর দোকান ধনমায়া লামার। ২০২৩-এর ২৬ জুন তাঁর দোকানে আচমকা ঢুকে পড়েছিলেন মমতা। কী ভাবে বানাতে হয় দেখে নিয়ে চটজলদি নিজের হাতেই তৈরি করেন কয়েকটা মোমো। ধনমায়া বলেন, 'সেই সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে মোমোর ব্যবসা নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। সেই ছবি আমার দেওয়ালে আজও টাঙানো রয়েছে। কিন্তু কতদিন রাখতে পারব জানি না। এই ছবি দোকানে থাকলে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি, পরিচিতরা অনেকে আমাকে সতর্ক করেছেন।'

    মঙ্গলবাড়ি বাজার এলাকায় ছোট্ট চায়ের দোকান দীনবন্ধু রায়ের। ২০২৪-এর ৩ এপ্রিল বিকেলে পড়ন্ত রোদে কনভয় থামিয়ে মমতা দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর দোকানে। চায়ের পাত্রের দখল নিয়ে নিজেই চা বানান। মুহূর্তে ভিড় জমে যায় এলাকায়। আবেগে কাঁপছিলেন দীনবন্ধু। দু'বছর পরে পরিস্থিতি অনেক বদল হয়েছে। কেন? দীনবন্ধু বলেন, 'দল আসে, দল যায়। মুখ্যমন্ত্রী যে এসেছিলেন সেটা পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে আমার সঙ্গে তাঁর তোলা ছবি দোকানে টাঙিয়ে রেখেছি। এখন ভয় হচ্ছে। কারণ, আমার দোকান রাস্তার ধারে পূর্ত দপ্তরের জমিতে। ওই ছবি সরিয়ে দেওয়ার জন্য অনেকে আমাকে সতর্ক করেছেন।'

    নিউ মাল এলাকায় জাতীয় সড়কের ধারে রয়েছে গব্বর পাসোয়ানের চায়ের দোকান। ২০১৮ তে মুখ্যমন্ত্রী এখানেও এসেছিলেন। কিন্তু প্রথম থেকেই গব্বর সেই ছবি রাখেননি। তাঁর বক্তব্য, 'আমরা আদার ব্যাপারী। জাহাজের খবর জেনে কী হবে।' তাঁর কথায়, 'রাজা আসে রাজা যায়। মাঝখানে যত কষ্ট শুধু প্রজাদের।'

    গোরুমারা জাতীয় উদ্যানের মূল গেটের কাছে টিলাবাড়ি, ছোট্ট জনপদ। জাতীয় সড়কের ধারে ওই ছোট্ট তেলেভাজার দোকানে দাঁড়িয়ে চপ-বেগুনি খেয়ে অন্যদেরও খাইয়েছিলেন মমতা। মালিকের প্রশংসা করে দোকানটিকে আরও ভালো করে বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সামনে থাকা জেলাশাসকের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'নীচে দোকান মালিক থাকবেন। উপর তলায় তেলেভাজা তৈরি করা হবে।' এমন উলটপুরাণে তাঁর যুক্তি ছিল, 'উপরের হালকা নরম বাতাসে তেলেভাজা ভালো ফুলে উঠবে।' কিন্তু সেই আশ্বাস আর পূরণ হয়নি। দোকান আজও ভাঙাচোরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মমতা অনেকের জন্য হয়তো করেছেন, তবে আমার জন্য করবেন বললেও কিছু করেননি। বাড়ির লোকই এখন আমাকে নানা রকম কথা শোনায়।'

  • Link to this news (এই সময়)