কৌশিক রায়, শুভাশিস সৈয়দ:
কালবৈশাখীর ঝড় উঠেছে। নিশ্চিন্দিপুরে সলতে খাগীর বাগানের আমগাছগুলো যেন নুয়ে পড়ছে মাটিতে। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। আচমকাই শুরু হলো বৃষ্টি। বাতাসার মতো বড় বড় ফোঁটা পড়ছে টুপটাপ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝরছে আম। বাগান জুড়ে যেন হরির লুট।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আম কুড়োচ্ছে অপু আর দুর্গা। আটপৌরে শাড়িটা ভিজে গায়ে লেপ্টে গিয়েছে। ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছে অপু। একটা করে আম কুড়োচ্ছে, আর বাড়িয়ে দিচ্ছে দিদির দিকে। সেগুলো আঁচলে ভরে রাখছে দুর্গা। একটু একটু করে বাঙালির গোটা শৈশব আটকে পড়ছে দুর্গার আঁচলে, অপুর হাফপ্যান্টে। আচ্ছা, ওই আমগুলো কি হিমসাগর ছিল?
রবিবার (৩১ মে) ‘মন কি বাত’-এ পঞ্চমুখে বঙ্গের হিমসাগরের প্রশংসা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আসলে গরম বাড়ছে। এই সময় একটু ঠান্ডাঠুন্ডি করতে হয়। সেই সূত্রেই তাঁর কথায় উঠে এসেছিল বিভিন্ন রাজ্যের বিখ্যাত সব জাতের আমের নাম। গুজরাতের কেশর, উত্তরপ্রদেশের দসেহরি, কাশীর ল্যাংড়া, বিহারের জারদালু, চৌসার কথা যেমন বলেছিলেন, তেমনই ঠাঁই করে নিয়েছিল বাংলার হিমসাগরও। গোটা পর্বটাই হয়ে উঠেছিল ‘আম’-ময়।
বৈশাখ হলো আম নিয়ে আমোদের মাস। রস, রসিক আর রসালো আমের ত্রিবেণী সঙ্গমে ডুব দেওয়ার কাল। বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় দুধের দাঁত ওঠার পরেই। বর্ণপরিচয়ের পাতায় ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে’-র পরেই ‘আ-এ আমটি খাব পেড়ে’ দিয়ে তার আমের সঙ্গে বোঝাপড়া শুরু হয়। যাকে বলে মিষ্টিমধুর গোড়াপত্তন। তার পর তো ‘আম পাতা জোড়া জোড়া/ মারব চাবুক চড়ব ঘোড়া’ ছুটতে শুরু করে। শত শত বছর পেরিয়ে সেই পক্ষীরাজ আজও ছুটে চলেছে শাশ্বত বাংলায়।
আমের মুকুল ধরা থেকে আম পাকা এবং তার পরে দুধ-মিষ্টি সহযোগে তা উদরস্থ করা পর্যন্ত একটা টাইমফ্রেম রয়েছে। সেটাকে মাস দিয়ে ভাগ করে দিয়েছিলেন খনা। ‘মাঘে বোল, ফাগুনে গুটি, চৈত্রে কাটাকুটি, বৈশাখে আঁটি, জৈষ্ঠে দুধের বাটি।’ যেন সেই প্রবচন মেনে এই সময়ে বাজারে আসে হিমসাগর। মাখনের মতো ত্বক, পাতলা খোসা। গায়ের রংটাও খাসা, হালকা সবুজ। গড় ওজন ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম। এ বারও মালদা ও মুর্শিদাবাদে প্রচুর হিমসাগর হয়েছে। নবাবের রাজ্যের লালবাগ, জিয়াগঞ্জ, আজিমগঞ্জ থেকে শুরু করে ভগীরথীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, আবার সীমান্তঘেঁষা মালদার ইংরেজবাজার, কালিয়াচক, মানিকচক—চারদিকে শুধু হিমসাগরের ঘোর লাগা মিষ্টি গন্ধ। বাতাসেও যেন জলীয় ভাব বেশি। আমের রস মিশে আছে যে।
আবহাওয়াও অনুকূল। বরুণদেবের আশীর্বাদে শিলাবৃষ্টি হয়নি। সংযম দেখিয়েছে প্রকৃতিও। বৈশাখের ভোরের হাওয়ার মতো সর্বত্রই যেন আম ছড়িয়ে রয়েছে। শুধু কাটো আর খাও। তবে আম কাটার বিধিনিষেধ রয়েছে। বাঙালির কাছে এ তো আর নিছক ফল ভক্ষণ নয়, এক ধরনের আচার। সবার আগে কাঁসার গামলা বা বালতিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। একটা পাত্রে ১০-১২টার বেশি নয়। না হলে আঠা ছাড়বে না। ‘থোড় বড়ি খাড়া’-য় কল্যাণী দত্ত লিখেছেন, ‘লোহার ছুরি কিংবা বঁটি দিয়ে কাটলে আমের গায়ে কালো দাগ পড়ে। স্বাদ নষ্ট হয়। এর জন্য চাই বালদোর ছুরি (তাল বা নারকেল পাতার শিরা কেটে বানানো)।’
আম কাটাকুটির আগে যেটা চাই, সেটা হলো রেস্ত। কিনতে হবে তো! এমনিতে হিমসাগর ৬৫-৭৫ টাকা কিলো বিক্রি হয়। কিন্তু এ বারে ফলন বেশি হওয়ায় দাম নাকি খুব একটা নেই। আজিমগঞ্জের শ্যামচাঁদ মণ্ডলের নিজের জমি রয়েছে। হিমসাগর চাষ করেন। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি। বাজার ভালো নয়।’ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আর তর্জনীটা ঠেকালেন দু’বার, ‘কাঁচা আম ১২-১৪ টাকা কিলো আর পাকা ২০-২৫ টাকা।’ তবে রপ্তানি হচ্ছে দেদার। ইতিমধ্যেই বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম, মহারাষ্ট্র থেকে প্রচুর বরাত এসেছে।
মালদা ম্যাঙ্গো মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উজ্জ্বল সাহা খুব খুশি। বলেই দিলেন, ‘৫০ হাজার মেট্রিক টন হিমসাগর উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রশংসা করায় বাজার ধরতে সুবিধা হবে। আশা করছি বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব।’ মুর্শিদাবাদে হিমসাগরকে আদর করে ডাকা হয় ‘শাহদুল্লা’ বা ‘শাদুল্লা’ নামে। এর চরিত্রেই একটা নবাবি মেজাজ আছে কি না। রহিসি চালচলন। সে শুধু নিজে ফলে না, আশপাশের মানুষের রুটি-রুজিও জোগায়। একটা গাছে কমবেশি ৫-৭ কুইন্টাল আম হয়। বিঘা প্রতি থাকে ১৫ থেকে ১৭টি গাছ। আম পাড়া থেকে শুরু করে ক্রেটে বাজারে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বিঘায় ৬ জন লাগে। বৈশাখ-জৈষ্ঠে তাই মালদা-মুর্শিদাবাদের অনেকেরই নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকে না। দৈনিক ৪০০ টাকা করে মজুরি। খাই খরচা আলাদা। এখানকার আম নিয়ে মুর্শিদাবাদ চেম্বার অফ কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্যের গর্বের শেষ নেই। হিমসাগরের নাম শুনেই চকচকে মুখে বললেন, ‘আমাদের মাটির গুণই আলাদা। স্বাদও অন্যরকম। এক বার খেলে আজীবন জিভে লেগে থাকবে।’
চিনা পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলায় এসে দেখেছিলেন আম নিয়ে কী রকম মাতামাতি চলে। ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সি-ইউ-কি’-তে তিনি গৌড়ের আমের অমৃতকথা লিখে গিয়েছেন। নিজে খেয়ে মুগ্ধ তো হয়েছিলেনই, বেঁধেছেঁদে নিয়েও গিয়েছিলেন প্রচুর। অবশ্য আমের এই জয়যাত্রা হিউয়েন সাংকে দিয়েও শুরু হয়নি। সময়ের স্রোতে আরও প্রায় এক হাজার বছর পিছিয়ে গেলেও তার খ্যাতির সন্ধান মেলে। ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজ়ান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় রাজা পুরুর প্রতিরোধের মুখে পড়লেও আম দেখে আর খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই শোনা যায়। বাংলার আমের অমরত্ব প্রাপ্তির নেপথ্যে নবাবদের হাতযশ অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৭০৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরিয়ে আনেন তাঁর রাজধানী। এসেই হাত লাগান আমবাগান তৈরিতে। সেই বাগান পাহারা দিত সশস্ত্র প্রহরী। কে জানত, পলাশীর সেই আমবাগানেই বাংলার সূর্য অস্তমিত হবে!
আজ সেই নবাব নেই। সেই নবাবিয়ানাও গিয়েছে কবেই। তবে প্রত্যেক আম বাঙালির মনের মণিকোঠায় একটা করে ‘আম’ চরিত মানস রয়ে গিয়েছে ঠিকই। আজ আর ঝড়ে আম কুড়োনো হয় না, সেই হাফ প্যান্ট নেই, আটপৌরে শাড়ির আঁচল নেই। তবে আজও মনে মনে আম আঁটির ভেঁপু বাজার কোনও এক দস্যি ছেলে। হায়, বাঙালির শুধু রাখাল সাজা হলো না।