আজকাল ওয়েবডেস্ক: রুদ্ধশ্বাস সাত ঘণ্টার লড়াই। কিন্তু শেষরক্ষা আর হল না। অবশেষে হাওড়ার বেলগাছিয়া ভাগাড় এলাকার গভীর নিকাশি ট্যাঙ্ক থেকে উদ্ধার হল ১৫ বছর বয়সী কিশোর অভিষেক রাওয়ের নিথর দেহ। প্লাস্টিক কুড়াতে গিয়ে অসতর্কতাবশত প্রায় ৭০ ফুট গভীর ওই বিষাক্ত নিকাশি ট্যাঙ্কে তলিয়ে গিয়েছিল সে। প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দলের যুদ্ধকালীন তৎপরতা সত্ত্বেও উদ্ধার করা গেল না জীবিত অবস্থায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার সকাল প্রায় সাড়ে ১০টা নাগাদ বেলগাছিয়া ভাগাড় এলাকার বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা পাম্পিং স্টেশন চত্বরে ভাই বিশালের সঙ্গে প্লাস্টিক কুড়াতে এসেছিল অভিষেক। এলাকার বাসিন্দা শ্রীয়ম বাল্মীকি, মণিমোহন ভাট্টাচার্য জানান, অসতর্কতার কারণে কিশোরটি খেয়াল করেনি সামনেই একটি গভীর নর্দমা বা ট্যাঙ্কের মুখ খোলা রয়েছে। আচমকাই পা পিছলে সে সোজা গিয়ে পড়ে প্রায় ৬০-৭০ ফুট গভীর ওই 'ওয়াটার ট্রিটমেন্ট' ট্যাঙ্কে। চোখের পলকে ভাইকে অতল কাদা আর বিষাক্ত পাঁকের মধ্যে তলিয়ে যেতে দেখে চিৎকার শুরু করে বিশাল।
খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে পৌঁছয় লিলুয়া থানার পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দল। কিন্তু উদ্ধারকাজের পথ মোটেও সহজ ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শী পরিমল ভট্টাচার্য জানান, নর্দমার ভেতর এতটাই পাঁক এবং কাদা ছিল যে প্রথমদিকে কিশোরটির কোনো হদিশই মিলছিল না। তার ওপর ছিল ট্যাঙ্কের ভেতরে জমে থাকা মারাত্মক মিথেন গ্যাস।
কিশোরকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জেদ বুকে নিয়ে শুরু হয় এক মানবিক লড়াই। জল, কাদা এবং ময়লা দ্রুত পাম্প করে বের করার জন্য একসঙ্গে ৪টি শক্তিশালী পাম্প নামানো হয়। সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক ওই ট্যাঙ্কের ভেতর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামেন ১০ জন ডুবুরি। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে আপ্রাণ তল্লাশি। অবশেষে দীর্ঘ ৭ ঘণ্টার টানটান উত্তেজনার পর, জল ও পাঁক সরিয়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয় অভিষেকের মৃতদেহ।
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাস্থলে এসে গভীর শোক প্রকাশ করেন স্থানীয় বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। দুর্ঘটনাটিকে 'অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক' বলে আখ্যা দিয়ে তিনি পূর্ববর্তী সরকারের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি জানান, ২০২৫ সাল থেকেই এই পাম্পিং স্টেশনটি বিষাক্ত মিথেন গ্যাস নির্গমনের কারণে অকেজো ও অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল।
বিধায়ক বলেন, "মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে হাওড়া পুরনিগম ও কেএমডিএ যৌথভাবে এই অঞ্চল পরিষ্কারের পরিকল্পনা শুরু করেছে। হাওড়ার জেলাশাসক পুরো বিষয়টি কড়া হাতে দেখছেন।" তবে এই এলাকাটিকে দ্রুত নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে মুড়ে ফেলার আশ্বাস দিলেও, কিশোরের মৃত্যুতে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ছাড়ছেন না স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। একটি তরতাজা কিশোরের এভাবে নর্দমায় পড়ে মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না বেলগাছিয়া।