‘জামাই মারী’! এমন কেন নাম এই জায়গার? নামের আড়ালে লুকিয়ে এক অদ্ভুত কাহিনী, জামাইষষ্ঠীর আগে এ গল্প
News18 বাংলা | ০৪ জুন ২০২৬
জামাইষষ্ঠী মানেই বাঙালির আবেগ, শ্বশুরবাড়ির নিমন্ত্রণ, জামাই আদর আর পারিবারিক উৎসবের এক অনন্য রূপ। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার কাছে এমন একটি জায়গা রয়েছে, যার নাম শুনলেই যেন উৎসবের আনন্দের আড়ালে ভেসে ওঠে এক করুণ স্মৃতি। জায়গাটির নাম জামাইমারী সরান বা জামাইমারী মোড়। কাটোয়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকার নামকরণ নিয়ে আজও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে এক লোককথা।
স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, বহু বছর আগে এই অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গল আর দুষ্কৃতীদের আস্তানা। সূর্য ডোবার পরই পথচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত আতঙ্ক। রাস্তায় যাতায়াতকারী মানুষদের লুটপাট করে হত্যা করত একদল ডাকাত। স্থানীয় বাসিন্দা গোপাল পোদ্দারের মুখে শোনা যায় সেই বহুল প্রচলিত কাহিনি। কথিত আছে, এক ব্যক্তি তাঁর শ্বশুরবাড়িতে আসছিলেন। রাত হয়ে যাওয়ায় রাস্তাতেই ডাকাতদের হাতে পড়েন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত সেই ডাকাত দলের মধ্যেই ছিলেন তাঁর শ্বশুর। জামাই বারবার নিজের পরিচয় দিলেও নেশাগ্রস্ত ডাকাতরা তা বিশ্বাস করেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করে সর্বস্ব লুট করে নেয়। পরে বাড়িতে ফিরে লুট করা জিনিসপত্রের মধ্যে জামাইয়ের আঙুলের আংটি দেখে মেয়ের মাধ্যমে সত্যিটা জানতে পারেন শ্বশুর। তখন আর কিছুই করার ছিল না। নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি নাকি সেই অপরাধের পথও ত্যাগ করেন।
সেই ঘটনার স্মৃতিতেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় ‘জামাইমারী’। আবার শিক্ষক প্রদীপ কুমার বক্সীর বক্তব্যে এই কাহিনির আরেকটি ব্যাখ্যাও উঠে আসে। তাঁর মতে, এটি মূলত একটি জনশ্রুতি। তবে উনিশ শতকে বাংলা-সহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ঠগী’ সম্প্রদায়ের দৌরাত্ম্যের ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে। পথচারীদের ওপর হামলা, লুঠপাট এবং হত্যার ঘটনা তখন অস্বাভাবিক ছিল না। জামাইমারী সরানের গল্পটিও সম্ভবত সেই সময়কার কোনও বাস্তব ঘটনার স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে রয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না মিললেও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে এর গভীর ছাপ রয়ে গেছে। তাই জামাইষষ্ঠীর মত উৎসবের সময় ‘জামাইমারী’ নামটি নতুন করে কৌতূহল জাগায়। যেখানে একদিকে জামাইকে ঘিরে আনন্দ-উৎসব, অন্যদিকে একটি এলাকার নাম বহন করে চলেছে এক জামাইয়ের মৃত্যুর কিংবদন্তি।তবে ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়ের পাশেই রয়েছে আলোর আরেক গল্প। এক সময় যে জায়গা আতঙ্কের প্রতীক ছিল, আজ সেই এলাকাই পরিচিত মানবসেবার কেন্দ্র হিসেবে।
প্রাক্তন বিধায়ক ডাঃ হরমোহন সিংহ রাজনৈতিক জীবন থেকে স্বেচ্ছায় সরে এসে ১৯৮৮ সালে এই জামাইমারী সরানকেই বেছে নেন সমাজসেবার কর্মক্ষেত্র হিসেবে। এখানে তিনি গড়ে তোলেন ‘আনন্দ নিকেতন’ নামে একটি বৃহৎ পুনর্বাসন কেন্দ্র। সমাজের অবহেলিত, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের জন্য তৈরি হয় নতুন আশ্রয়।
এখানে তাঁরা শুধু থাকার জায়গাই পান না, পান আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগও।একসময় যেখানে পথ হারাত মানুষের নিরাপত্তা, আজ সেই জামাইমারী সরানই হয়ে উঠেছে মানবতার এক উজ্জ্বল ঠিকানা। তাই জামাইষষ্ঠীর প্রাক্কালে এই নাম শুধু একটি করুণ কাহিনির স্মৃতি নয়, বরং অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য ইতিহাসও বহন করে চলেছে।