• অভিষেকের বহিষ্কার চাইছেন ঋতব্রতরা? ‘নেত্রী’ মমতাকে ‘ভীষ্ম’ বানিয়ে কৌশলী চাল ‘নতুন’ তৃণমূলের
    প্রতিদিন | ০৪ জুন ২০২৬
  • মমতা ভালো, অভিষেক খারাপ। ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণার পরই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন নতুন তৃণমূলের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সমস্বরে অন্য সঙ্গী বিধায়করাও সাফ বলে দিলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নেত্রী হিসাবে আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। আমরা চাই নেত্রী আমাদের পরামর্শ দিন। ওঁর পরামর্শ পেলে আমরা ভালো কাজ করতে পারব। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূল পরিষদীয় দলের কোনও সম্পর্ক নেই।”

    বস্তুত বিধানসভায় তৃণমূলের হারের পর দলনেত্রী যেদিন প্রথম বিধায়কদের বৈঠক ডাকলেন, সেদিনের বৈঠকের পরই ঋতব্রতরা অভিষেক এবং মমতার জন্য সমান্তরাল একটা রেখা টেনে দিয়েছিলেন। সাফ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী মানতে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘সেনাপতি’ মেনে নেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারপর থেকে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত একের পর এক নেতা অভিষেকের বিরুদ্ধে মুখ খুলছিলেন। স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তৃণমূলের এই ভরাডুবির জন্য দলের সিংহভাগ নেতা এক এবং একমাত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়ী মনে করেন। সম্ভবত অভিষেকের বিরুদ্ধে সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই ঋতব্রত এবং সন্দীপন এক ছাতার তলায় আনতে পেরেছেন ৬০ জন বিধায়ককে।

    বুধবার সরকারিভাবে রাজ্যে ‘নতুন তৃণমূল’ আত্মপ্রকাশ করল, ঋতব্রতর বিক্ষুব্ধ শিবির তৃণমূলের পরিষদীয় দলের মর্যাদা পেল, স্পিকারের বদান্যতায় ঋতব্রত বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসলেন। তারপর তিনি আরও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে তাঁরা মমতার পরামর্শ নিয়ে চলবেন। তাঁর প্রতি সম্মান আছে। কিন্তু অভিষেক নৈব নৈব চ। আসলে দলের মূল সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে ঋতব্রতরা তৃণমূলের পরিষদীয় দলকে আলাদা একটা বৃত্তে বেঁধে ফেলতে চাইছেন, সেই বৃত্তে এন্ট্রি নেই অভিষেকের। ঋতব্রত সাফ বলে দিলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের কোনও সম্পর্ক নেই। জনগণেরও কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক থাকলে ২৬ দিন লুকিয়ে থাকতেন না। চোরের মতো মার খেতেন না।” ঋতব্রতদের হাবেভাবে স্পষ্ট, অভিষেক যে দলে থাকবেন-সেখানে তাঁরা নেই। মমতা যদি অভিষেক সঙ্গ ত্যাগ করেন-তাহলে তাঁদের অবস্থান যে নরম হতে পারে, সেই ইঙ্গিতও মিলেছে বিদ্রোহীদের কথায়। তবে একই সঙ্গে ঋতব্রতরা এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন, মমতার ভূমিকাও থাকবে স্রেফ পরামর্শদাতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। দলের চালিকাশক্তি তাঁদের নিজেদের হাতেই থাকবে। যেখানে সিদ্ধান্ত কেউ একা নেবেন না, সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সম্মিলিতভাবে। 

    এখন প্রশ্ন হল, মমতা ভালো-অভিষেক খারাপ, ‘নতুন তৃণমূল’ এই তত্ত্ব কেন আওড়াচ্ছে? মমতাকেই যদি তাঁরা নেত্রী মানেন তাহলে অভিষেককে সেনাপতি মানতে আপত্তি কোথায়? নাকি মমতাকে নেত্রী বানানো ব্যাপারটা পুরোটাই কৌশল? তাঁকেই প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা? বস্তুত, এ কথা ঠিক যে এই বিদ্রোহী বিধায়ক গোষ্ঠীর সিংহভাগের মনে মমতার প্রতি সম্মান আছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নেত্রী মানতে তাঁদের আপত্তিও নেই বিশেষ। কিন্তু অভিষেকের প্রতি তাঁর অন্ধ’স্নেহ’ কেউই মানতে পারছেন না। যেভাবে অভিষেকের মতো ‘চাপিয়ে’ দেওয়া নেতা স্রেফ নেত্রীর স্নেহের সুযোগে নিয়ে গোটা দলের উপর কর্পোরেট স্টাইলে ছড়ি ঘোরাতেন-তাতে আপত্তি রয়েছে অনেকের। তাই ঋতব্রতরা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছেন, যাতে মমতাকে হয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নতুবা তাঁর প্রিয় দলের কোনও একটিকে বেছে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে মমতা পড়ে যাবেন উভয় সংকটে। যদি নিজের ভাইপোর পাশে দাঁড়ান, তাহলে গোটা রাজ্যে বার্তা যাবে, অপত্যস্নেহে অন্ধ মমতা নিজের দলকেও ছেড়ে দিতে পিছপা হলেন না। আবার যদি মমতা ঋতব্রতদের কথা মানেন (যা আপাতত অবাস্তব মনে হচ্ছে), তাহলে অভিষেককে রাজনৈতিকভাবে নিঃস্ব করে দিতে হয়। সেক্ষেত্রে তাঁর জেল যাত্রার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হবে। মমতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হবে। আর অভিষেককে রোজ ইডি-সিবিআই-সিআইডির সঙ্গে আইনি লড়াই লড়তে হবে।

    যা পরিস্থিতি তাতে মমতার অবস্থা এখন পিতামহ ভীষ্মের মতো। চোখের সামনে তাঁর সাজানো রাজ্যপাট উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে তছনছ হয়ে যাওয়ার মুখে। অথচ, কোনও পক্ষ নেওয়ার উপায় নেই। এখন তিনি কি নীরব দর্শকের মতো সবটা দেখবেন নাকি নিজেও এই মহারণে যোদ্ধা হিসাবে নেমে পড়ে ভাইপোর পক্ষে ব্যাটিং করবেন সেটাই দেখার।
  • Link to this news (প্রতিদিন)