সুমিত গুহ
ভোটের ফলে যতটা না নাটকীয়তা ছিল, তার চেয়ে বেশি নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়েছে ভোটের পরে তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বে। তৃণমূলের ভাঙনের রেখা আর অস্পষ্ট নয়। বরং তা ভীষণ ভাবে স্পষ্ট। উত্তরবঙ্গের আট জেলার মধ্যে চার জেলায় খাতাই খুলতে পারেনি পূর্বতন শাসক দল। উত্তরের ৫৪টি আসনের মধ্যে ঘাসফুলের ঝুলিতে গিয়েছে ১৪টি আসন। স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে যে এই ১৪ জনের মধ্যে কতজন 'পুরোনো' তৃণমূলে থাকলেন। আর কতজন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নব্য' তৃণমূলে নাম লেখালেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উত্তরের সিংহভাগ বিধায়কই কিন্তু 'দু নৌকোয়' পা দিয়ে চলছেন। কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ডাকা সভায় যাঁরা হাজির হয়েছিলেন। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করে সই করেছিলেন। তাঁরাই আবার বুধবার বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করে সই করেছেন। সেই সই জমাও পড়ে গিয়েছে বিধানসভার স্পিকারের কাছে। তবে এই দুই জায়গায় সই করা বিধায়করা কিন্তু তাঁদের নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কোনও বিধায়কই কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম মুখে আনেননি। -এর পাশাপাশি অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত উত্তরের কোনও বিধায়ককেই এদিন ঋতব্রতের পাশে দেখা যায়নি।
মালদায় তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ছ'জন। এঁদের মধ্যে এ দিন বিধানসভায় দেখা যায়নি তিন বিধায়ককে। প্রাক্তন মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন 'নব্য' তৃণমূলের পরিষদীয় দলের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত হয়েই তিনি বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতর মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছেন।
সাবিনা বলেন, 'আমরা একটা নতুন একটা জননেতা তৈরি করলাম। আমি ডেপুটি লিডার হয়েছি। তবে আমার নেত্রী কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।' এই বিধানসভার প্রবীণতম বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়কে বুধবার বিধানসভায় ঋতব্রতর পাশেই বসে থাকতে দেখা গিয়েছে। যদিও দল ভাঙনের বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। চাঁচলের বিধায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেখা গিয়েছে বিধানসভায়। তিনি কালীঘাটে গিয়ে শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা চেয়ে সই করেছিলেন। আবার এদিনও ঋতব্রতের সমর্থনে সই করেছেন। সভায় যাননি হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক মতিবুর রহমান। তিনি অভিষেক ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। দেখা যায়নি মোথাবাড়ির বিধায়ক নজরুল ইসলামকে।
তবে এই ডামাডোলের মধ্যেও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন মালতীপুরের বিধায়ক তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সি। তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে কিছুই বলব না। এখন আমি মালদার চাঁচলের বাড়িতে আছি। কোনও সভায় যাইনি। তবে একটা কথা বলতে চাই, আমরা দিদির সৈনিক এবং তৃণমূল কংগ্রেসে আছি। মালদার দলের অন্য বিধায়করা কী করলেন, সে নিয়ে আমার কাছে কোনও খবর নেই।
উত্তরবঙ্গে একমাত্র উত্তর দিনাজপুরে বিজেপিকে টপকে গিয়েছে তৃণমূল। ন'টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসন পেয়েছে ঘাসফুল। এর মধ্যে ইসলামপুর মহকুমায় চারে চার স্কোর করেছে তারা। কিন্তু এই চার বিধায়কই দু'জনকে বিরোধী দলনেতা চেয়ে স্বাক্ষর করেছেন। সেটা তাঁরা আবার স্বীকারও করেছেন।
চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমান বলেন, 'আমি তৃণমুল করি সেটাই বড় কথা। নতুন কোনও তৃণমূল তৈরি হয়নি। আপনারা সাংবাদিকরাই বিভ্রান্তি তৈরি করছেন। আমি বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সমর্থনে সই করেছি। আবার ঋতব্রতর হয়েও সই করেছি।' ঋতব্রতের পাশে দেখা মিললেও এ বিষযে ইসলামপুরের বিধায়ক তথা জেলা তৃণমূল সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল এ নিয়ে মুখ খোলেননি। তিনি বলেন, 'আমি এই বিষয়ে কিছু বলব না। এসব প্রশ্ন করাটাই ভুল।' দু' জায়গায় সাক্ষর করলেও মন্তব্য এড়িয়ে গিয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও গোয়ালপোখরের বিধায়ক গোলাম রব্বানি। যদিও চাকুলিয়ার বিধায়ক মিনহাজুল আরফিন আজাদ বলেন, 'আমাদের মহকুমার সব তৃণমূল বিধায়কই দুই জায়গায় সই করেছি। আমারা তৃণমূলের সঙ্গে ও মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছি।' ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেন অবশ্য পুরোনো অবস্থানেই রয়েছেন। তিনিও অভিষেক-ঘনিষ্ঠ।
দক্ষিণ দিনাজপুরের দুই বিধায়কের মধ্যে প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব মিত্র ঋতব্রতের পাশে। আর তোরাব হোসেন মণ্ডল 'পুরোনো' দলে। বিপ্লবকে এদিন বিধানসভায় দেখা যায়। যাননি তোরাব। তিনি বলেন, 'আমি প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলাম এবং আগামী দিনও তাঁর সঙ্গেই থাকব। এখন আর অন্য কোনও কিছুই ভাবছি না।' কোচবিহারের সবেধন নীলমণি সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা বর্মা বসুনিয়া আগেই অন্য ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কালীঘাটের সভায় যাননি। ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি দিল্লিতে। বৃহস্পতিবার ফিরছেন। আর ফিরেই ঋতব্রতের সমর্থনে সই করছেন বলে জানা গিয়েছে। পরিস্থিতি যা, তাতে তৃণমূলে যদি ভাঙন হয়, তাহলে উত্তরে সাইনবোর্ড হতে সময় লাগবে না 'পুরোনো'দের।