• দিল্লির ‘বেআইনি’ হোটেলে ভয়াবহ আগুন, বিদেশি সহ মৃত ২১ বোর্ডার
    বর্তমান | ০৪ জুন ২০২৬
  • দিব্যেন্দু বিশ্বাস, নয়াদিল্লি; অগ্নি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধি কার্যত শিকেয়! মাত্র ৬টি ঘরের অনুমতি নিয়ে ২৫টি রুমের আবাসিক হোটেল রমরমিয়ে চলছিল খোদ রাজধানীর বুকে। বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের সেই ‘বেআইনি’ হোটেলেই লাগল বিধ্বংসী আগুন। মূল প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় লেগে ঝলসে মৃত্যু হয় বেশ কয়েকজন বিদেশি সহ মোট ২১ জন আবাসিকের। ভিনদেশিদের বড়ো অংশই নাইজেরিয়া এবং সোমালিয়ার বাসিন্দা। ৪০ জন বোর্ডারকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অধিকাংশেরই শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। ফলে অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলেই আশঙ্কা। এদিনের ঘটনায় দমকলের বিরুদ্ধে দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ উঠেছে। উদ্ধারকার্যে নিযুক্ত ১০ জন পুলিসকর্মীও আহত অবস্থায় বর্তমানে দিল্লি এইমসে চিকিৎসাধীন। অন্যরা সফদরজং হাসপাতাল এবং হোটেলের উলটোদিকের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি। এই ঘটনায় গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশিই তামাম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মৃতদের পরিবারের জন্য দু’লক্ষ টাকা করে এবং আহতদের প্রত্যেকের জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে দিল্লির বিজেপি সরকার। তদন্ত শুরু করেছে দিল্লি পুরনিগমও। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন হোটেলের মালিক লবকেশ বাজাজ।

    পালাম ও বিবেক বিহারে অগ্নিকাণ্ড, সাকেতে বাড়ি ভেঙে পড়া— সাম্প্রতিকতম অতীতে দিল্লিতে একের পর এক ঘটনায় ডবল ইঞ্জিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এদিন মালব্যনগরের অগ্নিকাণ্ডে আরও বিপাকে দিল্লির বিজেপি সরকার। আগুন লাগার কারণ হিসাবে প্রাথমিকভাবে দু’টো তত্ত্ব উঠে এসেছে, শর্ট সার্কিট এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের জেরে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় হোটেলের ‘সেন্সর লকড’ মূল প্রবেশপথ। যাবতীয় কাচের জানালা স্থায়ীভাবেই বন্ধ করা ছিল। ফলে আগুন লাগার পরেও বেশ কিছুক্ষণ ভিতরে আটকে থাকেন বোর্ডাররা। বাইরে থেকে পাথর ছুড়ে এবং হাতুড়ির আঘাতে জানালার কাচ ভাঙা হয়। প্রাণ বাঁচাতে হোটেলের চার এবং পাঁচতলা থেকে ঝাঁপ দিতে থাকেন একের পর এক আবাসিক। শিশুসন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঝাঁপ দেন একজন মহিলাও। নীচে মোটা গদি পেতে দিয়েছিলেন এলাকার মানুষ। তাতেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কারণ, হোটেলের জানালাগুলির আশপাশে বৈদ্যুতিক তারের ‘জঙ্গল’ রয়েছে। আবাসিকদের কেউ কেউ সোজা সেই বিদ্যুতের তারের উপর পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। কয়েকজন আবার নীচে পেতে দেওয়া গদির পরিবর্তে আছড়ে পড়েন পাশের পাথুরে রাস্তায়। গুরুতর আহতও হন।

    জানা যাচ্ছে, মাত্র ছ’টি ঘরের অনুমোদন নিয়ে অবৈধভাবেই চলছিল ২৫টি রুমের ওই হোটেল। দিল্লির বিজেপি সরকারের নাকের ডগায় বসে, মালব্যনগরের মতো অভিজাত এলাকায় রমরম করে চলছিল তাদের ব্যবসা। কীভাবে এত বড়ো গাফিলতি প্রশাসনের নজর এড়িয়ে গেল? তা নিয়েই শুরু হয়েছে চর্চা। হোটেল মালিকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই খুনের মামলা রুজু করেছে দিল্লি পুলিশ।

    অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাজনৈতিক তরজা শুরু হতে দেরি হয়নি। সরব হয়েছে আপ, কংগ্রেস, বাম দলগুলি। এদিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্পষ্টই বোঝা গিয়েছে, গোটা এলাকাই একেবারে জতুগৃহে পরিণত। ঘিঞ্জি গলিতে গাড়ি এবং বাইকের ভিড়ে হাঁটাই দায়! গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো রয়েছে বৈদ্যুতিক তারের জঙ্গল। হাসপাতাল এবং হোটেলের সামনে দিনভর অপেক্ষা করেছেন মৃত ও আহতদের আত্মীয়রা। আদৌ বেঁচে আছে কি? বেঁচে থাকলে কোথায় আছে? চলছে উত্তর খোঁজা।
  • Link to this news (বর্তমান)