• গোটা বাড়ি এসি, ফিল্টার জলে শৌচকর্ম! পল্টুর বৈভব দেখে তাজ্জব কালনাবাসী
    বর্তমান | ০৪ জুন ২০২৬
  • সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: পর্যটন মানচিত্রে কালনা বহু আগেই জায়গা করে নিয়েছে। দেশ-বিদেশের পর্যটরকরা এখানে এসে প্রাচীন স্থাস্পত্য দর্শন করে মুগ্ধ হন। বেশ কয়েক বছর ধরে কালনার বাসিন্দারা মজা করে তাঁদের বলেন, সময় থাকলে শহরের ঘটকপাড়া একটু ঘুরে আসতে পারেন। দেখতে পাবেন নতুন স্থাপত্য। সেটিও একটি দ্রষ্টব্য। সেটি ‘পল্টু জমিদার’-এর বাড়ি! জমিদারি প্রথা বিলোপ হয়েছে ১৯৫০ সালে। কিন্তু, দেড় দশকের তৃণমূল জমানায় অনেক ‘নব্য জমিদার’-এর আবির্ভাব ঘটেছে পূর্ব বর্ধমান জেলায়। তাঁদের একজন দেবপ্রসাদ বাগ। তবে, কালনায় পল্টু নামে তিনি সমধিক পরিচিত। ভাগ্যিস রাজ্যে পালাবদল হয়েছে! তা না হলে পল্টুর ‘জমিদারিত্ব’ চাক্ষুস করার সৌভাগ্য হতো না কারও। সৌজন্যে পল্টুর শ্রীঘর যাত্রা। মঙ্গলবার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কোমরে দড়ি বেঁধে প্রতাপশালী তৃণমূল নেতা থুড়ি ‘জমিদারবাবু’কে নিয়ে যায়। আর রাত থেকেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন ভিড় করতে শুরু করেন ঘটকপাড়ায়। হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকছেন পল্টুর প্রাসাদের দিকে। সকলের মধ্যেই ফিসফাস—পুরসভার চেয়ারম্যান হলেই কি এভাবে ‘জমিদার’ হওয়া যায়! দর্শকদের মধ্যে অনেক প্রবীণ মানুষজনও ছিলেন। যাঁরা পল্টুকে ছোট থেকে বড় হতে দেখেছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ একটু অন্যরকম। বলছেন, বছর কয়েক আগেও রেডি-টিভি সারাই করে যে ছেলেটার সংসার চলত, তাঁর এহেন ‘রাজপ্রাসাদ’! বাইরে বেরোলে তাঁর ‘জমিদারি’ মেজাজ। পোশাক-আশাকেও ‘ব্র্যান্ডেড সিগনেচার’। ছেলেটাকে দেখলেই মনের ভিতর কেমন একটা ঘোর ঘিরে আসে। পল্টুর ‘রাজপ্রসাদ’-এর অন্দরমহলে ঢোকার সুযোগ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের ঘোর লাগা আরও একটু বেশি। এমন ক’জন পড়শির মুখে শোনা, গোটা বাড়িটাই সেন্ট্রালি এসি। দামি মার্বেলে মোড়া প্রতিটি ঘর। সাজানো গোছানো দামি আসবাবপত্রে। শৌচালয়ে ফিল্টার করা জল। অর্থাৎ, প্রাত্যহিক শৌচকর্ম থেকে স্নান—সবই হয় জীবানুমুক্ত পরিস্রুত জলে!  

    স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পল্টুর এহেন উত্থান, ঐশ্চর্য, প্রতাপ—সবই শাসন ক্ষমতার মাহাত্ম্য। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বদলে যেতে থাকেন একদা ছাপোষা পল্টু। পুরসভায় চেয়ারম্যান হতেই কেল্লাফতে! ফুলতে থাকে পকেট। সেই সময় শহরে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পুকর ভরাট থেকে অবৈধ নির্মাণ। কিন্তু পল্টুর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাধ্যি কার! তৃণমূলের কলকাতার লবির সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম। তারপর পল্টু হয়ে গেলেন বিধায়ক। দম্ভ বেড়ে চতুর্গুণ। মাটিতে যেন পা পড়ে না একদা রেডিও মিস্ত্রির।  অহংকারে অন্ধ তিনি। শহরের বাসিন্দা, দলের লোকেদের সঙ্গেও র্দুব্যবহার করে বেশ মজা পেতেন পল্টু। কালনার এক তৃণমূল নেতা বলছিলেন, পল্টুর বিরুদ্ধে বারবার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু, কলকাতার কয়েকজন নেতার সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ছিল মধুর। তাই পল্টুকে চটাতেন না কেউই। কালনার বর্তমান বিজেপি বিধায়ক সিদ্ধার্থ মজুমদার এদিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তৃণমূলের জমানা এখন অতীত। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। সব কিছুই সামনে আসবে।

    পুলিশ মঙ্গলাবার রাতেই পল্টুর বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তাঁকেও সঙ্গে রাখা হয়। পল্টুকে দেখা মাত্রই জমায়েত থেকে আওয়াজ ওঠে, ‘চোর, তোলাবাজের’ কড়া শাস্তি চাই। তাঁকে জনগণের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিও ওঠে। ক’বছর আগে শহরের এক নাবালকের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার নতুন করে তদন্তের দাবি তোলেন স্থানীয়রা। পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, পল্টুর নামে নতুন করে আরও কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে। সবগুলিই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে, তৃণমূল নেতা দেবু টুডু অবশ্য বলেন, ‘আমাদের নেতা কর্মীদের নামে মিথ্যা কেস দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে।’
  • Link to this news (বর্তমান)