• কোটি কোটি টাকার সরকারি চাল আত্মসাৎ! গ্রেপ্তার অনুব্রত ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতা তথা রাইস মিল মালিক
    বর্তমান | ০৪ জুন ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: কোটি কোটি টাকার সরকারি চাল আত্মসাতের অভিযোগে অবশেষে বীরভূমের চালকল সিন্ডিকেটের ‘অঘোষিত সম্রাট’ রাজীব ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার হলেন। তিনি আহমদপুর অঞ্চল তৃণমূলের সভাপতিও ছিলেন। বুধবার দুপুরে আহমদপুরের একটি রাইসমিলে অতর্কিতে হানা দিয়ে পুলিশ অনুব্রত মণ্ডল ‘ঘনিষ্ঠ’ রাজীব এবং তাঁর ব্যবসায়িক পার্টনার চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। ধৃত দু’জনেরই বাড়ি আহমদপুর এলাকায়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের বিরুদ্ধে সাঁইথিয়া থানায় দু’টি এবং পুরুলিয়ার পাড়া থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেছিল খাদ্যদপ্তর। সব মিলিয়ে প্রায় ১১হাজার ৩০০ মেট্রিক টন সরকারি চাল খোলা বাজারে পাচার ও আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।

    খাদ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী চাষিদের কাছ থেকে কেনা ধান থেকে চাল তৈরি করার জন্য রাজীবদের চালকলে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, সেই ধান থেকে চাল তৈরি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি গুদামে ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু সাঁইথিয়ার দু’টি ও পুরুলিয়ার একটি মিল মিলিয়ে প্রায় ১১হাজার ৩০০ মেট্রিক টন চাল সরকারি খাতায় আর জমা পড়েনি। দফায় দফায় নোটিস পাঠানো সত্ত্বেও রাজীবরা কোনও সদুত্তর দিতে না পারায় গত মে মাসের মাঝামাঝি খাদ্যদপ্তর থানায় লিখিত অভিযোগ করে। তার ভিত্তিতে পুলিশ বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের কঠোর ধারায় মামলা রুজু করে এই দু’জনকে গ্রেপ্তার করল।

    পুলিশ সূত্রের খবর, জেলায় একসময় এমন লক্ষাধিক ভুয়ো রেশন কার্ড ছিল, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেই কার্ডগুলির জন্য প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ চাল বরাদ্দ হত, তা সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে ঘুরতি পথে চলে আসত রাজীবের মিলেই। পরে সেই চালই নতুন বস্তায় ভরে ফের সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হত। খাদ্যদপ্তরের একাংশের সঙ্গে ‘গোপন সেটিং’ ছিল রাজীবের। তাছাড়া জেলার সিংহভাগ ধান ক্রয় কেন্দ্র বা সিপিসি নিজের কুক্ষিগত করে এই বিপুল দুর্নীতি চালানো হত। রাজনৈতিক পেশীশক্তি খাটিয়ে অন্য মিলগুলিকে কোণঠাসা করে রাখা এই ‘রাইসমিল সম্রাটে’র পতনে জেলা রাজনীতিতে শোরগোল পড়েছে।

    একদা জেলা রাজনীতির দাপুটে নেতা অনুব্রত মণ্ডলের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ‘ছায়াসঙ্গী’ ছিলেন এই রাজীব। ২০২২সালে গোরু পাচার মামলায় অনুব্রত গ্রেপ্তার হওয়ার পরই সিবিআই ও ইডির নজরে আসেন ওই রাইসমিল মালিক। অনুব্রতর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য একলপ্তে ৬৬লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন এই রাজীবই। এই আর্থিক লেনদেনের উৎস খুঁজতে দিল্লির সদর দপ্তরে তাঁকে জেরা করেছিলেন তদন্তকারীরা। অনুব্রতর একাধিক বেনামি চালকলের দেখভাল ও আর্থিক লেনদেনও পিছন থেকে রাজীবই নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, রাজীবের স্ত্রী আহমদপুর পঞ্চায়েতের প্রধান এবং একটি স্কুলের শিক্ষিকা হলেও পঞ্চায়েত ভবন বা স্কুল, কোথাও তাঁকে দেখা যেত না। 

    একসময়ের লটারি বিক্রেতা রাজীবের কোটি কোটি টাকার রাইস মিলের মালিক হওয়া নিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের কৌতূহলের অন্ত ছিল না। যে বিত্ত-বৈভবের দাপটে একদা প্রশাসন তাঁকে সমঝে চলত, সেই প্রশাসনই তাঁকে আইনি খাঁচায় বন্দি করল।
  • Link to this news (বর্তমান)