• বিদ্রোহে দু’টুকরো মমতার তৃণমূল, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত
    বর্তমান | ০৪ জুন ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি কলকাতা: দল প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর ৫ মাস ২ দিনের মাথায় দু’টুকরো হয়ে গেল তৃণমূল। এক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর হল আর এক বন্দোপাধ্যায়ের কাছে। যে দল ১৯৯৮ সালে তৈরি করেছিলেন মমতা, তিনি সর্বভারতীয় সভানেত্রী থাকাকালীনই সেই দলে আজ আলাদা ‘প্রেশার ব্লক’। পরিষদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ গেল ‘টিম ঋতব্রত’র কাছে। বিদ্রোহী তৃণমূল প্রকাশ্যে জানিয়ে দিল, তাদের পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মমতাই তাঁদের নেত্রী। বুধবার ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সই সম্বলিত চিঠি দিয়ে তৃণমূলের ‘প্রেশার ব্লক’ বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন বসুকে জানিয়ে দেয়, ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা। তাঁর ডেপুটি জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহা। দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান। অধ্যক্ষের স্বীকৃতি ও অনুমতি মেলার পর এদিন বিকালেই বিরোধী দলনেতার ঘর খুলে দেওয়া হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য। বিদ্রোহের আঁচ আরও সামনে এসেছে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা ও হাওড়া জেলা নিয়ে ওই আলোচনায় ‘অপ্রত্যাশিতভাবে’ উপস্থিত ছিলেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, অশোক দেব, সমীর পাঁজা, অরূপ রায় সহ তৃণমূলের দু’ডজনের বেশি বিধায়ক। কয়েকটি নাম আবার ‘প্রেশার ব্লকে’র বাইরের। তাতে জল্পনা বেড়েছে। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছেন বিরোধীদের। এলাকার সমস্যার কথা শুনেছেন ও অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছেন তার সমাধানের জন্য। এছাড়াও হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্টও জমা দিতে বলেছেন। শুভেন্দুর বার্তা ছিল, সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে। পুলিশ-প্রশাসনও বিরোধী বিধায়কদের সবরকম সহযোগিতা করবে। ভোট পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত যাবতীয় অভিযোগের রিপোর্টও তিনি চেয়েছেন ডিজির কাছে।

    গত দু’দিন ধরে আড়াআড়িভাবে তৃণমূল ভাঙনের যে গুঞ্জন ইতিউতি শোনা যাচ্ছিল, তার পরিসমাপ্তি অবশ্য এদিন হয়ে যায় সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদই। ফাইল-কাগজপত্র নিয়ে বিধানসভায় প্রবেশ করেন তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেশার ব্লকের তরফে ‘প্রকৃত তৃণমূল’ হওয়ার দাবি পেশ করেন। বিকাল পাঁচটার সময় স্বীকৃতি মেলে অধ্যক্ষের তরফে। ঋতব্রত বলেছেন, ‘আমরা ৫৮ জনের একটি টিম। এই টিমে আরও দু’জন বিধায়ক আসবেন, তাঁরা রাজ্যের বাইরে রয়েছেন। আমরা টিম হিসাবে কাজ করব। এই টিমের তরফে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে অনুরোধ, তিনি আমাদের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে থাকুন। আমরা কর্পোরেট কায়দায় চলব না। রাজ্য সরকারের গঠনমূলক বিরোধিতা করব।’ বিধানসভার অন্দরে তৃণমূলের যে ‘আলাদা ব্লক’ তৈরি হল, তা কি সংসদেও হওয়া সময়ের অপেক্ষা? ঋতব্রতর উত্তর, ‘সংসদের তৃণমূলের ফার্স্ট বেঞ্চার যাঁরা আছেন, তাঁরা বলতে পারবেন। তবে এটা বলব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সং-এ আছেন, গঠনে নেই।’

    এদিন সকাল থেকেই টানটান উত্তেজনা ছিল বিধানসভায়। চর্চা আরও বেড়ে যায়, যখন বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, ‘বিরোধী দলের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আমাদের রয়েছে। সকালে বিধানসভার গেট দিয়ে বিদ্রোহী বিধায়কদের গাড়ি এক এক করে প্রবেশ করার সময়ই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, দল ভাঙা শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রাক্তন মন্ত্রী রথীন ঘোষ, অরূপ রায়, জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, আখরুজ্জামান, শিউলি সাহা আসেন বিধানসভায়। বিধানসভার ভিতরে নৌসের আলি কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আগেই ডাকা ছিল। সেখানেই হাজির ছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা। তবে ‘বিরোধী দলনেতা’ নিয়েই যে আলোচনা হবে, তা ফাঁস করে দেন সাবিনা। প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহার আরও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘ঋতব্রতকে তো আমরা বিরোধী দলনেতা মেনেই নিয়েছি। বাকি সবটাতে সায় দেওয়া বাকি!’

    সময় যত এগয়, দেখা যায় ইমানি বিশ্বাস, নিয়ামত শেখ, প্রিয়া পাল, শুভাশিস দাস, তাপস মাইতি সহ একঝাঁক বিধায়ক প্রবেশ করছেন বিধানসভায়। সকলেরই মুখে তখন চওড়া হাসি। দিল্লি থেকে ফিরে সকাল সওয়া ১১টা নাগাদ বিধানসভায় প্রবেশ করেন অধ্যক্ষ। নিজেদের বৈঠক শেষ করে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়করা ১২টা নাগাদ অধ্যক্ষের চেম্বারে গিয়ে ৫৮ জনের স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেন।
  • Link to this news (বর্তমান)