এই সময়: বাংলার ঘন জনবসতিপূর্ণ গাঙ্গেয় সমভূমি অবাক করল বিজ্ঞানীদের। ভারতীয় কীটতত্ত্বের ইতিহাসে যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন জ়ুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জ়েডএসআই)–র বিজ্ঞানীরা। খোঁজ মিলল পরাগ–সংযোগে সহায়ক হোভারফ্লাই (ফুলের মাছি)–এর দু’টি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির। এরিস্টালিনার স্যাফিরিনাস এবং এরিস্টালিনাস ব্রুনেটি—এই দুই নতুন প্রজাতির আবিষ্কার ভারতের পরিচিত এরিস্টালিনাস গোষ্ঠীর প্রাণীবৈচিত্রের তালিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে প্রথম সংযোজন। এর আগে এই গোষ্ঠী নিয়ে শেষ বড় গবেষণামূলক অবদান এসেছিল ১৯২৩–এ।
ইতিমধ্যেই নতুন গবেষণাটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানপত্রিকা ‘ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ ট্যাক্সোনমি’-তে প্রকাশিত হয়েছে। জ়েডএসআই–এর তিন গবেষক বৃষ্টি রায়, ঐশিক কর এবং জয়িতা সেনগুপ্ত এই অনুসন্ধান চালিয়েছেন কলকাতায় সংস্থার সদর দপ্তরের ‘ডিপ্টেরা’ অর্থাৎ ‘প্রকৃত মাছি’ নিয়ে কর্মরত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অতনু নস্করের তত্ত্বাবধানে।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, ‘সিরফিডি’ পরিবারের সদস্য হোভারফ্লাই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা ফুলে–ফুলে ঘুরে উদ্ভিদের পরাগ–সংযোগে সাহায্য করে। এর ফলে বাস্তুতন্ত্র সুস্থ থাকে। পরিবেশের প্রতি তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্ত্বেও গত ১০৩ বছর ধরে এই অঞ্চলে তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূলধারার বাইরেই ছিল। জ়েডএসআই–এর তরফে বিজ্ঞানী অতনু নস্কর বলেন, ‘প্রধানত ২০২২ থেকে ২০২৫–এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগহ করা নমুনা বিশ্লেষণের কাজ শুরু হয়। প্রধানত শারীরিক গঠনগত (মরফোলজিক্যাল) পরীক্ষা এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বারকোডিংয়ের সমন্বয়ে গঠিত আধুনিক ট্যাক্সোনমিক পদ্ধতি ব্যবহার করে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে এগুলি সম্পূর্ণ অজানা দু’টি পৃথক প্রজাতি।’
পতঙ্গবিদদের অবাক করেছে হোভারফ্লাই–এর দু’টি প্রজাতির প্রাপ্তিস্থান। জ়েডএসআই জানিয়েছে, সদ্য সন্ধান পাওয়া প্রজাতি দু’টির মধ্যে একটির দেহ নীলকান্তমণি-নীল ধাতব আভাযুক্ত। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে বিজ্ঞানসম্মত নাম দেওয়া হয়েছে এরিস্টালিনার স্যাফিরিনাস। এটির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে হুগলির আরামবাগে। অন্যটির নাম এরিস্টালিনাস ব্রুনেটি রাখা হয়েছে ভারতীয় মাছি-বিষয়ক গবেষণায় ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ এনরিকো অ্যাডেলেলমো ব্রুনেটি–র নামে।
জ়েডএসআই–এর অধিকর্তা ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীববৈচিত্র শুধু দূরবর্তী বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। গাঙ্গেয় সমভূমির মতো ঘনবসতি এলাকাও বহু অজানা প্রাণের আশ্রয়স্থল। প্রকৃতি তার ভাণ্ডারে এখনও অসংখ্য অজানা গল্প আমাদের আবিষ্কারের অপেক্ষায় রেখেছে।’ অন্য দিকে, প্রধান গবেষক বৃষ্টি রায় বলেন, ‘পরাগবাহী পতঙ্গ সুস্থ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে। হোভারফ্লাই তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে কম পরিচিত। এক শতাব্দী পরে এই দু’টি নতুন প্রজাতির আবিষ্কার দেখিয়ে দেয় যে আমাদের পতঙ্গবৈচিত্রের কত বড় অংশ এখনও নথিভুক্তই হয়নি, এমনকী প্রতিদিনের পরিচিত পরিবেশের অনেকটাও এখনও অজানা।’