লোকসভা-রাজ্যসভাতেও ভাঙনের মুখে তৃণমূল, সিংহভাগ তৃণমূল সংসদ যোগাযোগ রেখে চলেছেন বিদ্রোহীদের সঙ্গে
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৪ জুন ২০২৬
দেবাশিস দাস–তৃণমূল কংগ্রেসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধিপত্য মানতে নারাজ দলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক। সেকারণে তৃণমূলের ভাঙন অবশম্ভাবী হয়ে পড়ে। এই ভাঙন রোখার মতো ক্ষমতা বর্তমান পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইতিমধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক তৃণমূলের বহিস্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা চেয়ে অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠিকে মান্যতা দিয়েছেন বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু। বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকাশ্যে আসার পর এবার সেই প্রভাব লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আর যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। বিধানসভায় গঠিত বিদ্রোহী তৃণমূল ব্লকের সঙ্গে ইতিমধ্যেই লোকসভার একাধিক সাংসদ এবং রাজ্যসভার কয়েকজন সদস্য যোগাযোগ রাখছেন। বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদ রয়েছেন। রাজ্যসভায় তৃণমূলের সদস্যসংখ্যা ১৩। সিংহভাগ লোকসভা এবং রাজ্যসভার সাংসদ তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে চলেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রকৃত তৃণমূল কারা তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হতে পারে আদি ও বিদ্রোহী তৃণমূল দুই পক্ষ। শেষপর্যন্ত তৃণমূলের প্রতীক এবং আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সবকিছু কোন পক্ষ পাবে তা নিয়ে জোরদার আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মতো লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়বে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে দ্রুত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে গুরুত্বপূর্ণ কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে তৃণমূল দলের মধ্যে তিনি যে ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়বেন এমনই পরিস্থিতি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এদিকে বিধানসভায় তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়ক দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নতুন গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। জানা গিয়েছে, বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৫৮ জন বিধায়ক সমর্থন জানিয়েছেন। মোট ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সমর্থন থাকায় তাঁরা নিজেদের প্রকৃত পরিষদীয় দল হিসেবে দাবি করেছেন। সেই ভিত্তিতেই ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একই ধরনের পরিস্থিতি লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও তৈরি হতে পারে। বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ২৯ জন সাংসদ রয়েছেন। দলবদল বিরোধী আইনের আওতার বাইরে থেকে নতুন সংসদীয় গোষ্ঠী গঠন করতে গেলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সেই হিসেবে লোকসভায় প্রায় ২০ জন সাংসদের সমর্থন লাগবে।সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই ১৭ জনেরও বেশি তৃণমূল সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জল্পনা ছড়িয়েছে।
এই তালিকায় বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নামও উঠে আসছে। সম্প্রতি তিনি জেলা সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তার আগে দলের সংসদীয় মুখ্যসচেতকের পদ থেকেও তাঁকে সরানো হয়েছিল। এরপর সামাজিক মাধ্যমে তাঁর করা একটি আবেগঘন পোস্ট রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করে। পরে জেলা সভাপতির পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত ঘিরেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
অন্যদিকে, রাজ্যসভাতেও তৃণমূলের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। তবে সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর দলের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন রাজ্যসভার সদস্য সুখেন্দু শেখর রায়। তাঁর কথায়, কয়েক দিনের মধ্যেই পার্টিটাই শেষ হয়ে যাবে। নিজের দলের বিরুদ্ধেই এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেছেন, জাতীয় রাজনীতিতেও তৃণমূল কংগ্রেস তার বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ হারিয়েছে, যার ফলে এখন দেশের কোনো দলই আর তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলাতে চাইবে না। আরজি কর কাণ্ড থেকে শুরু করে একাধিক দুর্নীতিকেই দলের এমন পরাজয়ের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিন্দুধর্মকে নিয়ে করা কুরুচিকর মন্তব্যকে তিনি ভুল বলে দাবি করেছেন।
বিধানসভার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর তৃণমূলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদি লোকসভা ও রাজ্যসভাতেও একই ধরনের সমীকরণ তৈরি হয়, তাহলে দলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হতে পারে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে কতজন সাংসদ শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেন এবং দলীয় নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপরই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
বিধানসভায় যেমন বিদ্রোহী বিধায়করা গিয়ে অধক্ষের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের মতামত জানিয়েছেন ঠিক একই ভাবে রাজ্যসভা ও লোকসভায় তৃণমূল সাংসদদের মধ্যে যাঁরা বিদ্রোহী হবেন তাঁদের সঙ্গে লোকসভার অধ্যক্ষ কথা বলে মতামত জানতে চাইবেন এটাই রীতি। এখন দেখার এই দুই কক্ষে তৃণমূল সাংসদের অবস্থান কি হয় ? সেক্ষেত্রে দলের মূল মালিকানা কার হাতে থাকে তা নিয়ে অন্তহীন জল্পনা শুরু হয়েছে যা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও ছড়াবে, নাকি পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্যকোনো রণকৌশল গ্রহণ করবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— সেই উত্তরই খুঁজছে রাজনৈতিক মহল।