বঙ্গভবনে মাত্র দু’মিনিটের একটি সাক্ষাৎ। দুজনের মুখোমুখি হওয়ার ছবিটা দেখে অনেকেই তা নিছক সৌজন্য বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের সেই দেখা হওয়া যে কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলার রাজনীতির অঙ্ক বদলে দেবে, আঁচ করতে পারেননি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর গত ২২ মে দিল্লির হেইলি রোডে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথিশালা বঙ্গ ভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বঙ্গভবনের সেই স্বল্প সময়ের সাক্ষাতে মুখ্যমন্ত্রীকে ঋতব্রতের কাঁধে হাত রেখে কথা বলতে দেখা যায়। সেদিন থেকেই তাঁর দলবদলের জল্পনা শুরু হলেও ঋতব্রত তা নস্যাৎ করে দাবি করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়াটা সম্পূর্ণ আকস্মিক।
কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ঋতব্রতই রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তৃণমূলের অন্দরে নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরির মুখ হয়ে উঠে তিনি কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে। একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে তাঁর কথাবার্তায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বার্তা একেবারে স্পষ্ট- অভিষেককে ছাড়াও চলতে পারে ‘নতুন তৃণমূল’। তবে এই নাটকীয় পরিবর্তনের নেপথ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কৌশল রয়েছে বলেই অভিমত রাজনৈতিক মহলের একাংশের। তাঁদের মতে, সামনের ঋতব্রত থাকলেও এই রাজনৈতিক চালের মূল কারিগর শুভেন্দুই।
ঘটনার সবচেয়ে বড় পরিহাস অন্যত্র। যে ব্যক্তি আজ তৃণমূলের ভিত কাঁপানোর মুখ, তাঁর রাজনৈতিক উত্থান বাম রাজনীতি থেকেই। প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ বলয়ে পরিচিত ঋতব্রত এক সময় এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৩ সালে দিল্লিতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে ঘিরে বিক্ষোভ ও হেনস্থার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধেই। তারপর বহু রাজনৈতিক বাঁক। অনেক জল গড়িয়েছে গঙ্গা দিয়ে। সিপিএম থেকে বহিষ্কার, তৃণমূলে যোগ, রাজ্যসভার সাংসদ এবং পরে বিধায়ক। আর এখন তিনি বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক সফরের পরও ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, চিন্তায় ও মননে ঋতব্রত আজও বামপন্থী। ফলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল পরিহাসের সাক্ষী রাজ্য- একদা বাম রাজনীতির পোস্টার বয়ই আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ। আর সেই কারণেই বহু বাম সমর্থকের মুখে এখন চাপা তৃপ্তির হাসি!