• বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কদেরই বিরোধী দলের মর্যাদা, মমতাকে প্রধান পরামর্শদাতা চান ঋতব্রত
    eTV Bharat | ০৪ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 3 জুন: রাজ্য রাজনীতিতে বেনজির পটপরিবর্তন এবং অভাবনীয় সমীকরণ । রাজ্য বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়ে গেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের 58 জন বিক্ষুব্ধ বিধায়ক । বুধবার রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোস বিক্ষুব্ধ শিবিরের দেওয়া চিঠিতে সিলমোহর দিয়েছেন । স্পিকারের অনুমোদনের পরেই বিধানসভার সচিব সৌমেন্দ্রনাথ দাস বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তাঁর জন্য নির্ধারিত ঘরের চাবি তুলে দিয়েছেন । শাসকদলের অন্দরের এই ফাটল এবং বিধানসভার অন্দরে আস্ত একটি নতুন বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশে রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো আলোড়ন তৈরি হয়েছে ।

    বিরোধী দলনেতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পরেই এদিন বিধানসভায় সাংবাদিক সম্মেলন করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় । সেখানে তিনি জানিয়েছেন, আপাতত তাঁদের সঙ্গে 58 জন বিধায়কের লিখিত সম্মতি থাকলেও আরও দু'জন বিধায়কের পূর্ণ সমর্থন তাঁদের দিকেই রয়েছে । ফলে তাঁদের মোট সদস্য সংখ্যা 60 ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে তিনি দাবি করেন । পাশাপাশি, আগামী দিনে এই বিক্ষুব্ধ শিবিরের বিধায়ক সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ।

    এদিনই এই নতুন বিরোধী দলের উপ-দলনেতা হিসেবে চারজনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁরা হলেন জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, সন্দীপন সাহা এবং শিউলি সাহা । অন্যদিকে, বিধানসভায় চিফ হুইপের দায়িত্ব সামলাবেন আখেরুজ্জামান ।

    আগামী দিনে বিধানসভায় তাঁদের ভূমিকা ঠিক কী হবে, সে বিষয়েও এদিন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ঋতব্রত । তিনি জানান, এখন থেকে একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে তাঁদের নতুন পথচলা শুরু হল । সরকারের যে পদক্ষেপগুলি জনস্বার্থ বিরোধী বা ভুল বলে মনে হবে, তার কড়া বিরোধিতা করা হবে । তবে নিছক বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, বরং সরকারের কোনও ভালো কাজ থাকলে তার প্রতি পূর্ণ সমর্থনও থাকবে তাঁদের । যাবতীয় সিদ্ধান্ত সংসদীয় রীতি মেনে নিজেদের মধ্যে বৈঠকের মাধ্যমেই স্থির করা হবে ।

    তবে এই বিক্ষুব্ধ শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছেন, তাঁদের এই দলের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । বিষয়টি নিয়ে দলের চিফ হুইপ আখেরুজ্জামানও স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই । তাঁরা যে এখনও তৃণমূলেরই বিধায়ক, সেই বিষয়ে যেন কারও মনে কোনও রকম সংশয় না-থাকে ।

    কিন্তু ঠিক কী কারণে দলের অন্দরে এই বড়সড় ফাটল দেখা দিল, তা নিয়েও এদিন মুখ খুলেছেন বিক্ষুব্ধ নেতারা । বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরেই যে চরম টানাপোড়েন চলছিল, এদিন সেই ক্ষোভই উগরে দেন আখেরুজ্জামান । তাঁর অভিযোগ, তাঁদের দু'বার কালীঘাটে ডাকা হলেও বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁদের কোনও মতামতকেই বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়া হয়নি । এমনকি, একটি রেজোলিউশনের নামে দলীয় বিধায়কদের সই জাল করার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি । এদিন সাংবাদিকরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ তুললে ঋতব্রত বলেন, এই বিধানসভার সঙ্গে অভিষেকের দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই ৷ তবে মমতাকে প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে চান তাঁরা ৷

    এদিন বিধায়ক শিউলি সাহা বলেন, "আমরা তৃণমূল কংগ্রেসেই আছি । আমাদের দলের নাম তৃণমূল কংগ্রেস । আমাদের স্লোগান তৃণমূল কংগ্রেস জিন্দাবাদ । আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করব । মানুষের উন্নয়নের কাজ করব । দল বিরোধী দলনেতা নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারছিল না । আমরা সেই সমাধান করে দিয়েছি । আমাদের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । আমি বলব নেত্রী আমাদের পরামর্শ দিন ।"

    রাজনৈতিক মহলের মতে, এই গোটা পর্বের নেপথ্যে মূল কাণ্ডারী হিসেবে উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসছে । আর তাঁকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন এন্টালির বিধায়ক তথা স্বর্ণকমল সাহার ছেলে সন্দীপন সাহা । মূলত বিরোধী দলনেতা বাছাই এবং সই জাল করার অভিযোগ থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত ।

    এদিকে, এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই এদিন নবান্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । কলকাতা, দক্ষিণ 24 পরগনা এবং হাওড়ার বিধায়কদের নিয়ে সেই বৈঠক শেষ করে তিনি সোজা বিধানসভায় আসেন । সূত্রের খবর, বিধানসভায় এসে তিনি স্পিকার রথীন্দ্র বোসের ঘরে যান এবং সেখানে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কদের সঙ্গেও তাঁর একপ্রস্ত সাক্ষাৎ হয় ।

    ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই সাক্ষাতের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কিছুক্ষণ পরেই স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই চিঠিতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়ে দেন । সব মিলিয়ে বিধানসভার অন্দরে 60 জন বিধায়ক নিয়ে 'নতুন তৃণমূলের' এই আচমকা উত্থান আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে নতুন কোনও সমীকরণের জন্ম দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার ।
  • Link to this news (eTV Bharat)