সেবক-রংপো রেল প্রকল্পে জমি হস্তান্তরে ছাড়পত্র রাজ্য মন্ত্রিসভার, সিকিমের সঙ্গে যোগাযোগে নয়া দিগন্ত
eTV Bharat | ০৪ জুন ২০২৬
কলকাতা, 4 জুন: বহু প্রতীক্ষিত সেবক-রংপো রেল প্রকল্পের কাজে আরও গতি আনতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় 20 একর সরকারি জমি এই মেগা প্রকল্পের জন্য হস্তান্তরের প্রস্তাবে বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৷
এদিন রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে আয়োজিত মন্ত্রিসভার ওই বিশেষ বৈঠকেই এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এর ফলে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এই রেল প্রকল্পের কাজে যে জমি-জট বা পরিকাঠামোগত বাধা ছিল, তা অনেকটাই দূর হল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল ৷ রাজ্যের এই পদক্ষেপের ফলে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমের মধ্যে রেল যোগাযোগের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটা এলাকার ওই নির্দিষ্ট 20 একর জমি প্রথমে সরাসরি বন দফতরের হাতে তুলে দেওয়া হবে। মূলত সরকারি নিয়মকানুন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়গুলি সুনিশ্চিত করতেই এই নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। এরপর বন দফতর তাদের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেই জমি রেল প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের কাছে পাকাপাকিভাবে হস্তান্তর করবে।
প্রশাসন মনে করছে, এই নির্দিষ্ট জমিটি রেলের হাতে চলে এলে প্রকল্পের বাকি থাকা পরিকাঠামোগত কাজগুলি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। পাহাড়ি এলাকায় রেললাইন পাতার ক্ষেত্রে এমনিতেই নানা ধরনের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাধা থাকে, সেখানে জমির এই প্রশাসনিক ছাড়পত্র মেলায় রেলের কাজ অনেকটাই মসৃণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বুধবার নবান্নে মন্ত্রিসভার এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিতভাবে জানান। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মূলত উত্তরবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য সিকিমের মধ্যে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়নের লক্ষ্যেই রাজ্য মন্ত্রিসভা এই জমি হস্তান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, "এই বিশেষ রেল প্রকল্পটি আমাদের রাজ্য তথা দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলাকার পরিকাঠামোগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করতেই রাজ্য মন্ত্রিসভা দ্রুত এই জমি হস্তান্তরের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।" তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, সরকার চাইছে এই জাতীয় স্তরের প্রকল্পটি যাতে কোনওভাবেই জমির অভাবে মাঝপথে থমকে না থাকে ৷
উল্লেখ্য, সেবক-রংপো রেলপথ প্রকল্পটি বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত রেল অবকাঠামো উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সারা দেশে। এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো পাহাড়ি রাজ্য সিকিম সরাসরি ভারতীয় রেল নেটওয়ার্ক মূলস্রোতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
স্বাধীনতার পর থেকে সিকিমে যাতায়াতের প্রধান ভরসা 10 নম্বর জাতীয় সড়ক। কিন্তু এই রেল প্রকল্প চালু হয়ে গেলে যাত্রীদের যাতায়াত যেমন একদিকে ভীষণ রকম সহজ ও আরামদায়ক হবে, ঠিক তেমনই পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও এক আমূল পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি দুই রাজ্যের পর্যটন শিল্প এবং সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর এলাকাগুলির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাজকর্মেও এক অভাবনীয় এবং উল্লেখযোগ্য গতি আসবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করছেন অর্থনৈতিক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞরা ৷
রেল মন্ত্রকের অধীনস্থ এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেগা প্রকল্পে বর্তমানে একাধিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই রেলপথ নির্মাণের জন্য একাধিক দীর্ঘ সুড়ঙ্গ বা টানেল, বড় বড় সেতু এবং খাদের ধার ঘেঁষে পাহাড়ি রেলপথ নির্মাণের কাজ জোরকদমে এগিয়ে চলেছে। ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে এই কাজ যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হলেও, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তা দ্রুত সম্পন্ন করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি শেষ হলে শিলিগুড়ি বা সেবক থেকে সিকিমে যাতায়াতের সময় বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এর ফলে পাহাড়ি রাস্তায় যানজট বা বর্ষাকালে ধসের কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে নিত্যদিনের সমস্যা, তা থেকেও অনেকটাই রেহাই মিলবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পর্যটকদের।
সর্বোপরি, উত্তরবঙ্গের সমতল এবং পাহাড়ের সঙ্গে প্রতিবেশী পাহাড়ি রাজ্য সিকিমের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও মজবুত হবে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক এই জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে সেবক-রংপো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই ধরনের বড় ও জাতীয় স্তরের প্রকল্পগুলি দ্রুত আলোর মুখ দেখতে পারে। বন দফতরের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের এই আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে আগামী দিনে রেল কর্তৃপক্ষও তাদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে । এখন শুধু অপেক্ষা, কবে সেবক থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের হুইসেল সিকিমের রংপো স্টেশনে গিয়ে পৌঁছয় এবং দুই রাজ্যের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।