দিল্লির মালব্য নগরের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে এ বার সামনে এল দুর্ঘটনার কারণ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। বরং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ওই B&B-র মালিক লভকেশ বাজাজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যু-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে।
৩ জুন, বুধবার সকালে দক্ষিণ দিল্লির হাউজ রানি এলাকায় অবস্থিত ‘ফ্লারিশ স্টে’ (Flourish Stay B&B) নামে ওই হোটেলে আগুন লাগে। ওই বিল্ডিংয়ের নিচের তলায় একটি রেস্তোরাঁ এবং উপরের তলাগুলিতে হোটেলের ঘর ছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন ও ঘন ধোঁয়া পুরো হোটেলে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে বহু অতিথি জানালা ও বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিতে বাধ্য হন। স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় গদি ও ম্যাট্রেস বিছিয়ে অনেককে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। যদিও ঘটনায় মর্মান্তিক ভাবে অগ্নিদগ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। যাঁদের মধ্যে ১৮ জনই বিদেশি। আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ জন। তাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা।
দিল্লি পুলিশের একাধিক সূত্রের দাবি, আগুনের উৎস খুঁজতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ, এয়ার কন্ডিশনার ইউনিট এবং বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ পরীক্ষা করছেন। প্রথমদিকে রান্নাঘরের এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আশঙ্কা করা হলেও এখন পর্যন্ত সিলিন্ডার ফেটে যাওয়ার কোনও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং শর্ট সার্কিট অথবা কোনও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ত্রুটি থেকেই আগুন লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, আগুনের ধরন ও তীব্রতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে, বিল্ডিংয়ের ওয়্যারিং সিস্টেমে কোনও সমস্যা থাকতে পারে। বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে এর সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তদন্তকারীদের মতে, সাধারণত লুকনো বৈদ্যুতিক তারে শর্ট সার্কিট হলে এই ধরনের ভয়াবহ আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুনের শিখা বাড়ির বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যায়।
অভিযোগ,অনুমতি ছাড়া ওই হোটেলে অনেক ঘর বানানো হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, ভবনের কাঠামোগত ত্রুটিও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন অংশে টাফেনড গ্লাস প্যানেল লাগানো ছিল, যা ধোঁয়া বের হওয়ার পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়ায় ভরে যায় সিঁড়ি ও করিডর।
এ ছাড়াও বিল্ডিংটিতে মাত্র একটি ঢোকা-বেরোনোর রাস্তা ছিল, যা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বেরোনোর রাস্তা না থাকায় বহু মানুষ আটকে পড়েন।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, হোটেলটির বিরুদ্ধে একাধিক নিয়মভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অনুমোদন ছিল মাত্র ছয়টি কক্ষের জন্য, অথচ সেখানে প্রায় ২৪টি কক্ষ চালানো হচ্ছিল। এমনকী অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে গুরুতর বিষয়, হোটেলটির বৈধ ফায়ার সেফটি ক্লিয়ারেন্স বা এনওসি (NOC) ছিল না বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই FIR নথিভুক্ত করেছে এবং বিল্ডিংয়ের মালিকানা, লাইসেন্স এবং নিরাপত্তা অনুমোদন সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখছে।