ছবিটা ইঙ্গিতবহ। ১৯৯৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর। আজকাল সংবাদপত্রের শহর সংস্করণের হেডলাইন, 'মমতা বহিষ্কৃত।' ঠিক ২৯ বছরের মাথায়, ২০২৬ সালের ২ জুন আজকাল পত্রিকার প্রথম পাতার খবর, 'ঋতব্রত, সন্দীপন দল থেকে বহিষ্কৃত!' তিন দশকের ব্যবধানে দুই বহিস্কার। দুই ভাঙন। কংগ্রেসি রাজনীতির ফের বাঁকবদল বঙ্গে। সেদিনের বহিষ্কৃত আজ বহিষ্কার করলেন দু'জনকে। সেদিন তিনি বহিষ্কারের পর যে দলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি করেছিলেন, সেই দলই ভেঙে বেরিয়ে এল তাঁর হাতে বহিষ্কৃত দুই নেতার হাত ধরে। বাংলার রাজনীতিতে এমন সময় কালেভদ্রে আসে, অনেক হ্যালির ধূমকেতুর মতো। কিন্তু আজ যখন সময় উপস্থিত, তখন রাজনীতির ছাত্ররা একে লিপিবদ্ধ করে রাখবেন না তা হয়! তবু, এ কথা বলা চলে, সেদিন আর এদিনের ফারাক অনেক। সময়, কাল, পরিস্থিতি পাল্টেছে, রাজনীতির ধরন পাল্টেছে, বিরোধী-শাসকের সমীকরণ পাল্টেছে, নতুন করে রাজনীতির যে ধারা তৈরি হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত কি খাপ খাইয়ে নিতে পারলেন না মমতা ব্যনার্জি? কোথায় ভুল হল?
সেদিনের কাগজে আজকালের সাংবাদিক মমতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'বহিস্কারের খবরে হাসছেন?' মমতা উত্তর দিয়েছিলেন, 'হাসব না তো কাঁদব নাকি!' হ্যাঁ, সেদিন তাঁর সঙ্কল্প অন্য ছিল। তবু প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি তাঁর বিরুদ্ধের বৃত্তের লোকেরাই ধীরে ধীরে তাঁর ছাতার আসবেন। সেদিন লেখা হয়েছিল, 'সুদীপ নিখোঁজ, সাধন নিরুদ্দেশ, পঙ্কজ, শোভনদেব, আকবর আলি খোন্দকার এখনও সঙ্গে। অনুগামী বিধায়কদের নিয়ে ক্ষুব্ধ পাঁজা (অজিত) একদিন সময় নিলেন।' তখনকার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্র সাংবাদিকদের বললেন, 'অনেক গালাগালি সহ্য করেছি, কিন্তু বিজেপি সম্পর্কে মমতার মনোভাব কিছুতেই মেনে নেওয়া গেল না। তাই বহিস্কার করতে বাধ্য হলাম।' সেই সোমেন এরপর তৃণমূল, নিজের দল, কংগ্রেসে বারবার যাতায়াত করবেন, ডায়মন্ডহারবার থেকে সাংসদ হবেন। তবে মমতার সঙ্গ তিনি আজীবন করে যাবেন, যদিও শেষের দিকে তিনি তৃণমূল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে সুদীপ ব্যানার্জি আর শোভনদেব চ্যাটার্জি এখনও মমতার কাছাকাছি আছেন। সাধন পাণ্ডে, পঙ্কজ ব্যানার্জি, আকবর আলি খোন্দকার প্রয়াত হয়েছে, প্রয়াত হয়েছেন অজিত পাঁজাও। সেই সময়ের এই তরুণ, টগবগে রাজনীতিকদের নিয়ে অনিশ্চয়তার সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন স্ট্রিট ফাইটার মমতা। কিন্তু নিয়তি অন্য ইতিহাস লিখবে বলে অপেক্ষা করছিল। তিরিশ বসন্ত পেরিয়ে তাই তাঁকে দেখতে হল এমন এক দিন, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তাঁর হাতে গড়া তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্য রাজনীতিতে কোনও রাজনৈতিক দলের যে পরিণতি হয়নি, সেই পরিণতির দিকে ক্রমশ যেন এগিয়ে গেল নির্বাচনের ফল ঘোষণার একমাসের মধ্যেই।
২০২৬ সালের ১ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাদের নিয়ে সারাদিন সরগরম ছিল সংবাদমাধ্যম। যিনি একদিন বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁরই দলের দুই বিধায়কের নাম করার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দু'জনকে তিনি বহিষ্কার করলেন। আর ঠিক তিনদিনের মাথায় ভেঙে গেল পরিষদিয় দল। ঋত-সন্দীপন-আখরুজ্জামানরা দাবি করলেন, তাঁরাই আসল তৃণমূল, তাঁদের প্রধান পরামর্শদাতা মমতা ব্যানার্জি। উল্লেখ না করেও তাঁরা বুঝিয়ে দিলেন, অভিষককে তাঁরা মানবেন না, মানছেন না। কী আশ্চর্য সমাপতন ইতিহাসের! তারপর থেকে ক্রমে একা হতে শুরু করল তৃণমূল ও ব্যানার্জি পরিবার। পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ফিরহাদ হাকিম, পদত্যাগ করলেন কৃষ্ণা চক্রবর্তী, জেলায়-জেলায় পুরসভার চেয়ারম্যানরা দায়িত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। শোনা গেল অনেকেই রাজি নয় অভিষেকের নেতৃত্বে থাকতে। কিন্তু মমতা তো বারংবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি চান অভিষেক থাকুন। তাহলে? অভিষেককে বাদ না দিলে তাঁর দল টিকবে তো? অভিষেক কি মমতার মতো করে তৃণমূলকে চালাতে পারবেন?
এই পর্বে মমতার একসময়ের সঙ্গী, বর্তমানে বিজেপির মন্ত্রী তাপস রায় বারংবার বলেছেন, তৃণমূল দলটার উঠে যাওয়া উচিত। পোড় খাওয়া বাম নেতার পুরনো সাক্ষাৎকারে ভেসে বেড়াচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। গৌতম দেব বলছেন, শি নাইদার ক্যান রান দ্যা স্টেট, নর পার্টি, তৃণমূল ধ্বংস হয়ে যাবে। সমস্ত ভবিষ্যৎবানী মিলে যাচ্ছে। সেদিন যে বহিষ্কার মমতার জীবনে সেরা পুরস্কার হয়ে এসেছিল, আজকে তেমনই এক বহিষ্কার তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বানপ্রস্থের বন্দনাগীত লিখতে শুরু করে দিল না তো? জানি না! মমতা ব্যানার্জি অবাক করা এক চরিত্র। রাজনৈতিক ময়দানে বিজেপি দল হিসাবে যদি সবচেয়ে আন-প্রেডিক্টেবল হয়, ব্যক্তি হিসাবে সবচেয়ে আন-প্রেডিক্টেবল মমতা। তবে বয়স তো কথা শোনে না। জীবন গিয়েছে চলে ৩০ বছর পার, মমতা এখন সত্তর পেরিয়েছেন। আগের মতো কঠিন লড়াই মাঠে-ময়দানে তিনি করতে পারবেন কি? শাসকের নিশ্চিন্ত আরাম তাঁকেও তো কিছুটা নরম করে দিয়েছে। ফলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। পাশাপাশি অভিষেক ব্যানার্জির কোনও অভিজ্ঞতাই নেই, থাকলে এই নির্বাচনে এমন ভরাডুবি হয়ত হতো না। রাজনৈতিক দল তো আর কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট নয়!
প্রদীপ ভট্টাচার্য একদিন আমাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মমতাকে বহিষ্কার করা সেদিন ভুল হয়েছিল। এতদিন পর সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি এখনও আফসোস করেন। হয়ত কালের চক্রে কোনওদিন ঋত, সন্দীপনদের বহিষ্কার নিয়ে তৃণমূলের কোনও এক মমতাপন্থী নেতৃত্বও একই কথা বলবেন। কিন্তু তখন আর সময় থাকবে না। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ধীরে-ধীরে, উত্তেজনা স্তিমিত হওয়ার পর কালীঘাট সম্পর্কে আগ্রহ কমছে মিডিয়ার। তারপর যাঁরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন, তাঁরাও ধীরে-ধীরে কমিয়ে দিচ্ছেন ও বাড়ির চৌকাঠ পেরনো। গণতন্ত্রের নিয়মে শাসক-বিরোধী ক্ষমতার টানাটানিতে ধূসর হয়ে যাচ্ছে বাংলার রাজনীতির এক ঘটনাবহুল অধ্যায়। বসন্তের ঝরা পাতার মতোর ধীরে-ধীরে চেনা পার্টি অফিসের চেয়ারে ধুলো পড়ছে। যে বহিষ্কার রাজনীতি জন্ম দিয়েছিল তাঁকে, সেই বহিষ্কার রাজনীতির চাপ সইতে না পেরে, একগুঁয়ে, একরোখা মমতা একলা হচ্ছেন। শরশয্যায় শুয়ে একলা হচ্ছেন। যেখানে যন্ত্রণাই সঙ্গী, আর সঙ্গী সুখস্মৃতি, বর্তমান সবটাই তেতো।