মতের পরিসর ছিল না, রাজনীতি থেকে সরে অভিযোগ মন্ত্রীর
আজকাল | ০৪ জুন ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। কোন্নগর কানাইপুরে তাঁর বাড়িতে বসে প্রাক্তন মন্ত্রী জানান, আর মাঠে ময়দানে নেমে রাজনীতি করবেন না। কোনও দলের সঙ্গেও যুক্ত থাকবেন না। তবে লেখালেখি, রাজনৈতিক আলোচনায় থাকবেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হুগলির জাঙ্গিপাড়া বিধানসভা থেকে কম ব্যবধানে বিজেপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন স্নেহাশিস। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তাঁকে আর রাজনীতির ময়দানে দেখা যায়নি। মমতা ব্যানার্জির ডাকা কর্মসূচিতেও যাননি। এরপরেই বৃহস্পতিবার ঘোষনা করলেন অনেক হয়েছে আর রাজনীতি নয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমান রাজনীতির সংস্কৃতি ও দলের কাজের ধরন তাঁর ভাবনার সঙ্গে আর খাপ খাচ্ছে না। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্বের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগ এবং নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করে নেত্রীর বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনে দলের পরাজয় প্রসঙ্গে স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, “পরাজয়ের পরে সমালোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক। অভিষেক ব্যানার্জি দলের হয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও জেলাস্তরের নেতৃত্ব এবং সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে আরও বেশি সরাসরি যোগাযোগ থাকলে ভাল হত। সেই জায়গাটাই সবচেয়ে বড় খামতি ছিল।”
তিনি আরও দাবি করেন, দলের অনেক নেতা-কর্মী সরাসরি মমতা ব্যানার্জির কাছে পৌঁছতে পারতেন না, যা সংগঠনের মধ্যে একটি বড় ঘাটতি তৈরি করেছিল। নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে স্নেহাশিস চক্রবর্তী স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে চান না। তাঁর কথায়, “দলের সমর্থক বা সাধারণ কর্মী হিসেবে থাকা যায়, কিন্তু মাঠে নেমে সক্রিয় রাজনীতি করার ইচ্ছা আর নেই। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না।”
বর্তমান রাজনীতির ধরন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজ একজনের বিরুদ্ধে বলতে হবে, কাল অন্যজনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে গিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে হবে, ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে হবে— এই রাজনীতি আমি পছন্দ করি না।”
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রসঙ্গেও পরিমিত সুরে মন্তব্য করেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “মানুষ শুভেন্দু অধিকারীকে ভোট দিয়েছে। তিনি লড়াকু নেতা এবং মানুষের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন। নতুন সরকারকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত। তারা মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে পরিবর্তন এনেছে, সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এখন তাদেরই।”
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তাঁর মতে, দলের মধ্যে বিধায়ক ও সাংসদদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের পরিসর খুবই সীমিত ছিল। নির্বাচনে পরাজয়ের পর অনেক জনপ্রতিনিধি নিজেদের মতো করে বিরোধী দলনেতা ও অন্যান্য পদ নির্ধারণ করছেন, যা দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি মনে করেন। আই-প্যাক নির্ভর রাজনৈতিক পরিচালনার প্রসঙ্গেও তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, দলের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ আরও বেশি থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
মন্ত্রী হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্নেহাশিস চক্রবর্তী জানান, পরিবহণ দফতরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তিন বছরের মেয়াদে দফতরের রাজস্ব প্রায় ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৭০০ কোটির গণ্ডি অতিক্রম করেছিল।
তবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য যে মানুষের উন্নয়ন হওয়া উচিত, সেই কথাই বারবার তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বাংলায় বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক হিংসা, প্রতিহিংসা, কুৎসা এবং অশালীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “রাজনীতি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে রাজনীতি মানেই সংঘাত, হিংসা আর প্রতিশোধ। এই সংস্কৃতির সঙ্গে আমি নিজেকে আর যুক্ত রাখতে চাই না।”
তিনি জানান, আগামী দিনে লেখালেখি, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে মতামত প্রকাশের মাধ্যমে জনপরিসরে সক্রিয় থাকবেন। পরিবারকেও সময় দেবেন।