বিপদের সময় সাধারণ মানুষই অসাধারণ কাজ করেন। দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ফের সেকথা প্রমাণিত হল। বুধবার দক্ষিণ দিল্লির মালব্যনগরের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। আহত হয়েছেন ৩৭ জন। পুলিশ-দমকল পৌঁছানোর আগে আহতদের উদ্ধারে নামেন স্থানীয় যুবকরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। এর ফলেই মৃতের সংখ্যা আরও বাড়েনি, বলছে প্রশাসনও।
মালব্যনগরের হউজ রানি এলাকার ওই হোটেল আগুন লাগতেই ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। ভিতরে আটকে পড়া বিদেশি পর্যটকরা আতঙ্কে চিৎকার করতে থাকেন, সাহায্য চান তাঁরা। মৃত্যু নিশ্চিত বুঝে অনেকে উপরতলা থেকে জানলা বেয়ে, লাফ দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেন। চোখের সামনে নারকীয় পরিস্থিতি দেখে চুপ করে বসে থাকতে পারেননি স্থানীয় যুবক মহম্মদ আফজল। তিনি বলেন, “আমি আর ভাইরা যখন হোটেলের কাছে পৌঁছাই, ততক্ষণে আগুন বড় আকার ধারণ করেছে। আমরা তাড়াতাড়ি রাস্তার ওপাশের দোকান থেকে মোটা গদি এনে তা বিছিয়ে দিই হোটেলের নিচে। আটকে পড়া পর্যটকরা যাতে লাফ দিয়ে বাঁচতে পারেন। অনেকেই সেভাবে বেঁচে গিয়েছেন।”
আফজল জানান, আগুন এত বেশি ছিল যে চাইলেও ভিতরে ঢুকতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত দমকল বাহিনী আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি বলেন, “এর পর পুলিশ, দমকল কর্মীদের সঙ্গে আমরাও আহতদের উদ্ধারে হাত লাগাই। আহতদের নিরাপদে নিচে নামাই। অনেকে তোশকে লাফ দিয়ে বেঁচে যান।” আফজাল আবেদনে স্থানীয় বেডিংয়ের দোকানদার আরমান নির্দ্বিধায় গদি এবং কম্বলের ব্যবস্থা করেন। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ান ওয়াসিম রাজাও। তিনি ম্যাক্স হসপিটালের কর্মী। তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কাজে আসে বিপদে। উদ্ধারের পর একাধিক পর্যটককে সিপিআর দিয়ে সাক্ষাৎ মৃত্যু থেকে ফেরান তিনি।
রাজা বলেছেন, “আমার মেডিক্যাল শিক্ষা কাজে এসেছে, জ্বলন্ত হোটেলের ভিতরে এবং বাইরে। অ্যাম্বুলেন্সে করে আহতদের নিয়ে যাওয়ার সময়ও।” রাজা দ্রুত নিজের হাসপাতাল ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। এর পরেই একটি মেডিক্যাল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাজা বলেন, “পুরো দল সময়মতো পৌঁছানোর ফলে আমরা অনেক জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি।” কেবল রাজা বা আফজলই না, স্থানীয় অন্য যুবকেরাও অসহায়দের বাঁচাতে সাধ্য মতো চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ম্যাক্স হাসপাতালের আরও এক কর্মী। তবে সকলেই আলাদা করে বলছেন, ম্যাট্রেস (গদি) ব্যবসায়ী বাবা-ছেলে রিয়াজুদ্দিন মনসুরি এবং আরমান মনসুরির কথা। তাঁরা দোকানের যাবতীয় গদি হোটেলের নিচের রাস্তায় বিছিয়ে দেন, যাতে হেটেলের আটকে পড়া পর্যটকেরা নিচে লাফ দিয়ে বাঁচতে পারেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২ লক্ষ টাকার গদি নষ্ট হয়েছে আর্তদের পাশে দাঁড়াতে। তথাপি মানুষকে বাঁচিয়ে খুশি রিয়াজুদ্দিন ও আরমান। সব মিলিয়ে ভয়ংকর বিপদ দেখিয়ে দিল—অসাধারণ কাজ করেন সাধারণ মানুষই।