একে একে নিভিছে দেউটি…! পরিষদীয় দল আগেই হাতছাড়া হয়েছে। সংসদীয় দলে ভাঙন সময়ের অপেক্ষা। এবার সম্ভবত কলকাতা পুরসভার রাশও বেরিয়ে যেতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে। সেখানেও ওই বিধানসভার ধাঁচেই আত্মপ্রকাশ করতে পারে নতুন তৃণমূল। কালীঘাটের অলিগলিতে কান পাতলেই সেই আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে।
বস্তুত রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই কলকাতা পুরসভায় টালমাটাল অবস্থা। ইতিমধ্যেই জনা দু’য়েক বরো চেয়ারম্যান, জনা কয়েক কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। দেবলীনা বিশ্বাস, তারক সিং, অরূপ চক্রবর্তী, সুশান্ত ঘোষদের মতো প্রথম সারির মুখও সেই তালিকায়। কাউন্সিলরদের নিয়ে দু’দফায় বৈঠক করেছেন খোদ দলনেত্রী। কিন্তু তাতেও বহু কাউন্সিলর গরহাজির ছিলেন। তাছাড়া পালাবদলের পর অধিকাংশ কাউন্সিলর পুরসভামুখো হচ্ছেন না। নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম লাটে। পরিস্থিতি এমনই যে মেয়র ফিরহাদ হাকিম পুরসভায় গিয়েও কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠক করতে পারেননি। এক্ষেত্রে অবশ্য পুর কমিশনারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার একটা অভিযোগ আছে।
এসবের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে শোনা যাচ্ছিল, ফিরহাদ মেয়রের পদ ছাড়তে চলেছেন। যদিও নিজে ফিরহাদ তেমন কিছু বলেননি। বুধবার বিকালে বিধানসভায় নতুন তৃণমূল আত্মপ্রকাশ করার পর কালীঘাট থেকে কুণাল ঘোষ বলে দেন, “সম্মানরক্ষার জন্য ফিরহাদ হাকিম মেয়র পদ ছাড়তে চলেছেন। তিনি নেত্রীর কাছে সসম্মানে পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। সেই ইচ্ছায় সম্মতি দিয়েছেন মমতা।” নিমেষে খবর ছড়িয়ে পড়ে ফিরহাদ পদত্যাগ করছেন। কিন্তু পরে সেই খবর ফিরহাদ নিজেই খণ্ডন করেন। তিনি জানান, ‘এখনও পদত্যাগ করিনি।’ তবে তিনি আগামী দু-একদিনের মধ্যে পদত্যাগ করতে পারেন বলে খবর।
কিন্তু প্রশ্ন হল, ফিরহাদ পদত্যাগ করার আগেই কেন তাঁর পদত্যাগের খবর কালীঘাট থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হল? তৃণমূল সূত্রের খবর, ফিরহাদে অসন্তুষ্ট তৃণমূলনেত্রী। আসলে বুধবার নবান্নে যে প্রশাসনিক বৈঠক ছিল, সেখানে হাজির ছিলেন ফিরহাদ। কিন্তু বিকালে তৃণমূল নেত্রীর বাড়িতে দলের বৈঠকে তাঁকে দেখা যায়নি। তাছাড়া নবান্নের বৈঠকে ফিরহাদকে বেশ খাতির করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফিরহাদকে দেখেই নাকি শুভেন্দু ‘মেয়র সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন। এমনকী তাঁকে চা ‘অফার’ করেন। সেসব জানার পর নাকি মমতার অসন্তোষ বেড়েছে। আসলে নেত্রী চাইছিলেন রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর যেভাবেই হোক পুরসভা ধরে রাখতে। তাতে যদি দরকার পড়ে তাহলে ফিরহাদের জায়গায় শোভন চট্টোপাধ্যায়কে মেয়র করা হবে। তাতে আইনি বাধাও বিশেষ নেই। কারণ, তৃণমূল জমানাতেই পুর আইন বদল হয়েছে। এখন কাউন্সিলর না হলেও মেয়র হওয়া যায়। অবশ্য মাস ছ’য়েকের মধ্যে কোনও ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসতে হয়। ফলে মমতা শোভনকে মেয়র করার ব্যাপারে একপ্রকার মনস্থ করে ফেলেছেন। তিনি চাইছেন ফিরহাদ ৫ জুনের মধ্যেই ফিরহাদ ইস্তফা দিন।
কিন্তু তাতে নারাজ ফিরহাদ। ফলে যা পরিস্থিতি তাতে যদি দলের চাপে ৫ জুন ফিরহাদকে পদত্যাগ চাপ দেওয়া হয়, তাহলে কলকাতা পুরসভার অন্দরেও ‘নতুন তৃণমূলে’র জন্ম হতে পারে। ফিরহাদের নেতৃত্বে তৃণমূল কাউন্সিলরদের সিংহভাগ কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করতে পারেন। ঠিক যেভাবে ঋতব্রত বিধানসভায় করেছেন। যার অর্থ ‘ভাই’ কাননের প্রতি শ্রদ্ধায় ছোট লালবাড়ির নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারেন মমতা।