• ‘আর পরীক্ষা দেওয়ার সাহস নেই...’, হতাশায় আত্মহত্যা NEET পরীক্ষার্থীর, সমালোচনায় সরব রাহুল-মমতা
    এই সময় | ০৪ জুন ২০২৬
  • NEET প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারির জেরে বলি আরও এক প্রতিভাবান প্রাণ। কত ত্যাগ, কত মাসের পরিশ্রমের প্রস্তুতি শেষে দেওয়া পরীক্ষাই হয়ে গেল বাতিল। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা ২২ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ২১ জুন ফের পরীক্ষা নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও এতে ভেঙে পড়েছেন একাধিক পরীক্ষার্থী। আবারও পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার হতাশা থেকেই চরম পদক্ষেপ নিলেন ১৮ বছর বয়সি আকাঙ্ক্ষা চতুর্বেদী। তিনি সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘আর পরীক্ষা দেওয়ার সাহস নেই। ক্ষমা করো বাবা-মা।’ নাগপুরের দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেধাবী ছাত্রীর সুইসাইড নোট সামনে আসতেই দেশ জুড়ে শোরগোল। বিরোধীদের নিশানায় কেন্দ্র।

    পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মধ্যপ্রদেশের মউগঞ্জ জেলার মগনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আকাঙ্ক্ষা গত কয়েক বছর ধরে ডাক্তার হওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি নাগপুরের একটি কোচিং প্রতিষ্ঠানে থেকে NEET-এর প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। সেই কোচিংয়ের খরচ জোগাতে তাঁর বাবা কিসান ক্রেডিট কার্ড মারফত তিন লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। আত্মীয়দের কাছ থেকেও নিয়েছিলেন টাকা। মেয়ে লক্ষ্যপূরণ করে সব অভাব পূরণ করবে এটাই ছিল আশা।

    তরুণীর পরিবারের দাবি, পরীক্ষায় তিনি ভালো ফল করবেন বলে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং ৬৫০-র বেশি নম্বর পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর আকাঙ্ক্ষা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

    গত ২০ মে নাগপুরে আকাঙ্ক্ষার ঝুলন্ত দেহ থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর পরিবারের হাতে একটি হাতে লেখা চিঠি আসে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন যে, তিনি আর নতুন করে NEET দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। চিঠিতে তিনি মা-বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখেন যে তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন মেয়ে একদিন ডাক্তার হবে, কিন্তু তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেন না। তিনি আরও লিখেছেন, প্রথম পরীক্ষায় তাঁর ভালো নম্বর আসার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু পুনরায় পরীক্ষা হলে একই ফল করার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

    এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় সরব বিরোধীরাও। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘এটি শুধুমাত্র আত্মহত্যা নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থার ফল’। তাঁর অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা বহু ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। তার পরেও কী ভাবে শিক্ষামন্ত্রী পদে রয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, সেই প্রশ্ন তুলেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। Re-NEET নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে রাহুল বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানজি আজও তাঁর চেয়ারে বসে আছেন। সেই একই কমিটি। সেই একই বদলি। সেই একই তদন্ত। কোনও সংস্কার নেই, কোনও ন্যায়বিচার নেই। মোদীজি, ক্ষমতা স্থায়ী নয়—তা আসে আর যায়। কিন্তু ১২ বছরে আপনি শিক্ষাব্যবস্থাকে যে পরিমাণে ধ্বংস করেছেন, তার মূল্য এখন দেশের তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগকে দিতে হচ্ছে।’

    এই বিষয়ে সুর চড়িয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘দেশ আজ এক অমূল্য তরুণ প্রাণকে হারাল এক NEET পরীক্ষার্থীকে, যার হৃদয়ে ছিল অসংখ্য স্বপ্নের এক বিশাল জগৎ। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। একটি স্বপ্ন নিভে গিয়েছে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া যন্ত্রণা সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হবে।’ এখানেই শেষ নয়, বিজেপি সরকারকে খোঁচা মেরে তিনি বলেন, ‘এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি BJP-এর শাসন আমলে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচয় হয়ে উঠেছে চরম অনিশ্চয়তা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, বারবার অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার মাধ্যমে কেন্দ্র সরকার মেধাকে পরিণত করেছে এক ধরনের জুয়ায়, আর আশাকে ঠেলে দিয়েছে হতাশার অন্ধকারে। এই অমানবিক শাসনব্যবস্থা বারবার এবং নির্লজ্জভাবে দেশের যুবসমাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে।’

    আপ সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়ালও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া ন্যায়বিচার নয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে শিক্ষা মাফিয়া সক্রিয় রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত সমাধান।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, পরীক্ষাজনিত অনিশ্চয়তা ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা ছাত্রছাত্রীদের জন্য ন্যায়বিচার কবে নিশ্চিত হবে?

    উল্লেখ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের জেরে NEET-UG ২০২৬ পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে এবং পুনরায় ২১ জুন পরীক্ষা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সাংঘাতিক মানসিক চাপে অনেকে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। NTA সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে যে Re-NEET-র জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেনাকেও কাজে লাগানোর ভাবনা।

  • Link to this news (এই সময়)