• ‘বাচ্চা ছেলে, রাজনীতির কিছুই বোঝে না’, অভিষেক নিয়ে বিস্ফোরক মুকুলপুত্র শুভ্রাংশু রায়
    এই সময় | ০৪ জুন ২০২৬
  • রাজ্যে পালাবদলের পরে এখন ‘তাসের ঘর’-এর মতো অবস্থা এখন তৃণমূল কংগ্রেসের। দলের সাংসদ থেকে বিধায়ক, প্রাক্তন বিধায়ক, কাউন্সিলাররা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। যতদিন দিন যাচ্ছে, দলের অন্দরে বিদ্রোহের চেহারা ক্রমশ বাড়ছে। এ বার সেই তালিকায় নাম লেখালেন তৃণমূলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায়ের পুত্র শুভ্রাংশু রায়। তিনি এক সময় বীজপুর বিধানসভার তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন। বর্তমানে কাঁচরাপাড়া পুরসভার তৃণমূলের ভাইস চেয়ারম্যান। এই সময় অনলাইনের সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে শুভ্রাংশ...

    ছাব্বিশের ভোটে তৃণমূল গতবারের ২১৫টি থেকে ৮০টি আসনে নেমে এসেছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যে হালিশহর, ভাটপাড়া, টিটাগড় পুরসভায় কাউন্সিলাররা গণ ইস্তফা দেন। সম্প্রতি, কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ তারক সিং-সহ একাধিক কাউন্সিলার পদত্যাগ করেছেন। গত দু’দিনে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তৃণমূলের বিধায়কদের কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসে। দলের এই ভরাডুবি নিয়ে কাঁচরাপাড়া পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান শুভ্রাংশু রায় বলেন, ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, মানুষকে অবহেলা, নিজেদের জাহির করার জন্য দলের এই ভরাডুবি।’ তাঁর দাবি, দলের নেতাদের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

    ছাব্বিশের নির্বাচনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় প্রচারে অন্যতম ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অভিষেককে নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মুকুলপুত্র। শুভ্রাংশু বলেন, ‘অভিষেক বাচ্চা ছেলে। ও রাজনীতির কিছু বোঝে না। কলেজ জীবনে কোনও দিন রাজনীতি করেনি। দোলনা থেকে নেমে হেল জেনসন (পড়ুন জেনসেন-হিলি, স্পোর্টস কার) চড়লে যেমন হয়, সেটাই হয়েছে।’ তাঁর মত, আসলে রাজনীতি করতে গেলে ঘাম ঝরাতে হয়। মাটিতে পা রেখে চলতে হয়। মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়। তাদের পাশে থাকতে হয়। ‘লিডার যদি সব সময় মাথা উচুঁ করে চলেন, কর্মীদের কথা না শোনেন, সব সময় কর্মীরা জয়ধ্বনি দেবেন ভাবেন, তা হলে যে ধরনের রেজ়াল্ট হওয়ার কথা সেটাই হয়েছে,’ বললেন শুভ্রাংশু।

    রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল। এক মাস ক্ষমতায় নেই এই দল। আর তাতেই একপ্রকার ‘তাসের ঘর’-এর মতো ভেঙে পড়ছে তৃণমূল। রাজ্যে একাধিক পুরসভা থেকে গণ ইস্তফা দিতে দেখা গিয়েছে তৃণমূল কাউন্সিলারদের। বিধায়করা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে শুরু করেছেন। এক কথায় বলা যেতে পারে, আড়াআড়ি ভাবে তৃণমূলে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। বুধবার, ৩ জুন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়করা বিধানসভায় বৈঠক করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচনের রেজ়োলিউশন গ্রহণ করেন। সেখানেই রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী আখরুজ্জামানকে বিরোধী সচেতক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই রেজ়োলিউশনে তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়ক স্বাক্ষর করেন। দলের এই অবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন শুভ্রাংশু, ‘মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতা থাকলে তৃণমূলের আজ এই হাল হতো না।’

    দলের এই ভরাডুবির জন্য রাজ্যের একাধিক নেতা I-PAC নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘দলে অবজ়ার্ভার পদ তুলে দিয়ে, আইপ্যাক নিয়ে এসে দলের সব গেল। এই আইপ্যাক নিয়ে আসা কার মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল, কে জানে!’ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, ‘দল পরিচালনায় সর্বনাশ করে গিয়েছে আইপ্যাক।’ এ বার শুভ্রাংশু রায় I-PAC নিয়ে কার্যত বোমা ফাটালেন। শুভ্রাংশুর মতে, ‘বাবা (পড়ুন মুকুল রায়) দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক থাকার সময়ে কখনও I-PAC এর মতো সংস্থার প্রয়োজন হয়নি। বাবা নিজ়াম প্যালেসের দু’টি ঘর থেকেই রাজ্যের সংগঠন সামলেছেন।’ I-PAC প্রসঙ্গে শুভ্রাংশু বলেন, ‘একটি চোর-জোচ্চরদের সংস্থা। কাজ ছিল শুধু লোকের থেকে টাকা তোলা। দলটিকে শেষ করতেই ব্যস্ত ছিল এই সংস্থা।’

    দীর্ঘদিন কলকাতায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরে চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ৭১ বছর বয়সে মৃত্যু হয় মুকুল রায়ের। মৃত্যুর পরে হাসপাতাল থেকে কাঁচরাপাড়ায় মুকুল রায়ের বাড়ি, শ্মশানঘাট পর্যন্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূলের একাধিক নেতা হাজির ছিলেন। আর এই বিষয়টিও মুকুলপুত্র ভালো ভাবে নেননি। তিনি বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পরে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের নেতারা যাতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসতে না পারেন, তার জন্য পরিকল্পিত ভাবে (মৃতদেহ) ঘিরে রাখা হয়েছিল। কাঁচরাপাড়ার বহু মানুষ বাবাকে দেখতে পাননি। আমার বাবাকে নিয়েও রাজনীতি করেছে।’

    তৃণমূলের বিধায়ক থেকে দলের নেতারা রাস্তা দিয়ে বের হলেই ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি, সোনারপুরে দলীয় কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এমনকী হাইকোর্টে গিয়েও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই স্লোগান শুনতে হয়েছে। আর এই প্রসঙ্গে মুকুলপুত্রের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘বাস্তবেই দলে দুর্নীতি চুরি হয়েছে। তাই, এই স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।’

    তৃণমূলের বিধায়ক থেকে দলের নেতারা রাস্তা দিয়ে বের হলেই ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি, সোনারপুরে দলীয় কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এমনকী হাইকোর্টে গিয়েও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই স্লোগান শুনতে হয়েছে। আর এই প্রসঙ্গে মুকুলপুত্রের সোজাসাপ্টা উত্তর, ‘বাস্তবে দলে দুর্নীতি, চুরি হয়েছে। তাই, এই স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।’

    এ বার বিধানসভায় তৃণমূলের টিকিট বিলির ক্ষেত্রেও টাকার খেলা হয়েছে বলে বিরোধী দলের অনেকেই অভিযোগ করেছে। এ বার মুকুলপুত্রও সেই একই অভিযোগ সামনে আনলেন। শুভ্রাংশু বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে এ বার আমাকে প্রার্থী করা হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে টিকিট দেওয়া হয়নি।’ তাঁর দাবি, এর পিছনে রয়েছে মোটা টাকার খেলা। আর তাতে একজন সাংসদের ভূমিকা ছিল।

  • Link to this news (এই সময়)