এই সময়: তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কদের ফের নিজের দিকে টানতে এ বার ময়দানে নামলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং!
ইতিমধ্যেই বিধানসভায় তৃণমূলের ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক রেজ়োলিউশন জমা দেওয়ার পরে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিরোধী দল নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এমনকী, দিল্লিতে বৃহস্পতিবার গিয়ে স্পিকার বলেন–– ‘ঋতব্রতকে বহিষ্কার পদ্ধতি মেনে হয়নি। দল থেকে বহিষ্কার করার আগে শোকজ় করতে হয়। সময় দিতে হয়। (তৃণমূল) দলের সংবিধান অনুযায়ী ওই বহিষ্কারের চিঠি বৈধ নয়। একদিনে দুম করে কাউকে বহিষ্কার করা যায় না।’
এই প্রেক্ষিতেই জোড়াফুলের পরিষদীয় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিক্ষুব্ধদের অসন্তোষ দূর করতে নিজেই বিধায়কদের ফোন করা শুরু করেছেন বলে দলীয় সূত্রের খবর। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি কালীঘাটের পাশে থাকা তৃণমূলের কয়েকজন বিধায়কও বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করেছেন। বিক্ষুব্ধদের মনজয় করতে মমতা নিজে যে উদ্যোগী হয়েছেন, সেই খবরও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জমান, সন্দীপন সাহা সহ বিদ্রোহীদের কাছে রয়েছে। এই আবহে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে বৃহস্পতিবার বিধানসভার বিরোধী কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করে বিদ্রোহী শিবির। সেখানে মমতার ফোন করার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক বিধায়ক দাবি করেছেন। তবে প্রকাশ্যে এখনও কোনও বিদ্রোহী বিধায়ক স্বীকার করেননি যে তাঁর কাছে মমতার ফোন এসেছে। এ দিন বিধানসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী পরিষদীয় শিবিরের বৈঠকের পরে পাঁচলার বিধায়ক গুলশন মল্লিক, সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা বসুনিয়া অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। বিধানসভার প্রেস কর্নারে দীর্ঘদিনের বিধায়ক গুলশন বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী মেনেই আমরা রেজ়োলিউশনে সই করেছি, তাঁকে তৃণমূলের পরামর্শদাতা বলা হবে–– এটা আমি মানব না। হাওড়া জেলার ৬–৭ জন বিধায়কও এটা মানবে না। কালীঘাটে আমরা যে বৈঠক করেছিলাম সেখানেও অন্তত ৬৮ জন সই করেছিলেন।’ কোচবিহারের সিতাইয়ের বিধায়ক সঙ্গীতা বসুনিয়া বলেন, ‘আমার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রতও তো মমতাকে নেত্রী বলেছেন।’
বিরোধী দলনেতা হওয়ার পরে ঋতব্রতর নেতৃত্বে আখরুজ্জমান সহ বিদ্রোহীরা বিধানসভার প্রেস কর্নারে মমতাকে ‘পরামর্শদাতা’ বা ‘মার্গদর্শক’ এর ভূমিকায় থাকার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সে সময়ে বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে থাকা গুলশন, সঙ্গীতা ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভিন্নসুরে কথা বলায় জোড়াফুলের বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। বিধানসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ঋতব্রত এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এই বিদ্রোহী শিবিরের প্রথম সারির এক মুখের বক্তব্য, ‘দু’চার জন কী বলছেন তাঁকে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। রেজ়োলিউশনে ৫৮ জন সই করেছেন। সেই চিঠি অধ্যক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন বিধায়করাই। পরিষদীয় নিয়ম মেনে ঋতব্রত বিরোধী দলনেতা হয়েছেন। আর আখরুজ্জমান বিরোধী সচেতক।’
বৃহস্পতিবার মমতার সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারের তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঋতব্রতকে সমর্থন করে যাঁরা রেজ়োলিউশনে সই করেছেন, তাঁদের অনেকেই দিদির সঙ্গে যোগাযোগে রয়েছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁদের কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে, কিন্তু দিদির প্রতি কোনও অভিযোগ নেই।’
মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ সহ তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন, ঋতব্রত তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক। সেই বিধায়ক কী ভাবে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের নেতা এবং বিরোধী দলনেতা হতে পারেন? তবে অধ্যক্ষের জবাবের পরে ঋতব্রত–সন্দীপনকে তৃণমূলের পক্ষে বহিষ্কৃত বিধায়ক বলা কঠিন হয়ে পড়বে বলে বিদ্রোহী শিবির মনে করছে। এমনকী, ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা চেয়ে রেজ়োলিউশনে সই করে বিধায়করা অধ্যক্ষকে তা জমা দেওয়ার পরে সেখান থেকে সরে যাওয়া কঠিন বলেও মনে করছে বিদ্রোহী শিবির।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে চেয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন তা অধ্যক্ষ ইতিমধ্যেই খারিজ করে দিয়েছেন। দিল্লিতে রথীন্দ্র বসু বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আইন মেনে কাজ করেছি। যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল সেখানে স্বাক্ষর নিয়ে সমস্যা ছিল। সেই কারণে সিআইডি তদন্ত করছে।’ এই প্রেক্ষাপটে মমতা নিজে ফোন করে বিদ্রোহীদের মনজয় করার চেষ্টা করলেও তা কতটা সফল হবে তা স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে কালীঘাটের অন্দরেও সংশয় রয়েছে। তৃণমূলের বিধায়কদের নিয়ে এই টানাপড়েন দেখে কটাক্ষ করেছেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি বলেন, ‘ভোট দেওয়ার কালির দাগ এখনও মুছে যায়নি, তার আগেই তৃণমূল বাংলা থেকে মুছে গেল। তৃণমূল আসলে ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছে।’