টলিউডে কত নোংরামি করেছেন স্বরূপ? 'জুনিয়র বিশ্বাসের' কীর্তি মারাত্মক
আজ তক | ০৫ জুন ২০২৬
টলিউডের বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছিলেন। অনেকে বলেন, টলিপাড়ার মাফিয়া। বিশ্বাস ব্রাদার্সের জুনিয়র বিশ্বাস। অর্থাত্ প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস। তোলাবাজি, হুমকি, খুনের চেষ্টা, শ্লীলতাহানি, বেআইনি অস্ত্র রাখা, স্বরূপের 'স্বরূপ' বেরিয়ে পড়েছিল আগেই, এবার পুলিশের জালেও। রিজেন্ট পার্ক এলাকার এক মহিলা মেক-আপ আর্টিস্টের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নামে নিউ আলিপুর থানা। তারপরেই অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপকে গ্রেফতার করা হয়।
টাকা না দিলে মিলত না কাজ
তিনি কাউন্সিলর ছিলেন না। বিধায়কও ছিলেন না। তবুও রাজ করতেন টলিউডে। অন্ধকার-রাজ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রিজেন্ট পার্ক এলাকার এক মহিলা মেক-আপ আর্টিস্টের অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তের সূত্রপাত। অভিযোগকারীর দাবি, তিনি মেক-আপ আর্টিস্ট গিল্ডের সদস্য হলেও গত প্রায় দু’বছর ধরে কোনও কাজ পাচ্ছিলেন না। কাজের সুযোগ চেয়ে যোগাযোগ করলে তাঁর কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়। শুধু তাই নয়, কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে বলেও তাঁকে জানানো হয়েছিল। সেই দাবি মানতে অস্বীকার করায় তাঁকে কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি।
অভিযোগ আরও গুরুতর। ওই মহিলা মেক-আপ আর্টিস্ট জানিয়েছেন, কাজের দাবি নিয়ে বারবার যোগাযোগ করার পর তাঁকে ভয় দেখানো হয়েছিল। এমনকী প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বাড়িতে গিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘদিন কাজ না পাওয়ার হতাশায় তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে নিজের অবস্থার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর অভিনেতা দেবের একটি ছবিতে কাজের সুযোগ পান।
টলিউডে ব্যান ও থ্রেট কালচার
পুলিশের কাছে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা এখন ৫। এই পাঁচটি অভিযোগ একত্রিত করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন দু’জন মহিলা এবং তিনজন পুরুষ। প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে টালিগঞ্জের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গিয়েছে।
স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা হল তোলাবাজির। অভিযোগকারীদের দাবি, স্টুডিওপাড়ায় কাজ করতে গেলে বা বিভিন্ন গিল্ড ও সংগঠনের সদস্যপদ পেতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের বিনিময়ে সুযোগ দেওয়া হত। বিভিন্ন কার্ড এবং অনুমোদনপত্রের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। টালিগঞ্জের বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীও প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ফেডারেশনের আমলে ব্যাপক তোলাবাজি চলত এবং বিভিন্ন কার্ড বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করা হত।
এছাড়াও, স্টুডিওপাড়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করার অভিযোগও রয়েছে স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। বহু কলাকুশলী এবং প্রযুক্তিকর্মীর অভিযোগ, তাঁর অপছন্দের ব্যক্তিদের কাজ থেকে বঞ্চিত করা হত। কাউকে ‘ব্যান’ করে দেওয়া, কোনও শিল্পী বা প্রযুক্তিকর্মীর শুটিং বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কাজের সুযোগ আটকে দেওয়ার মতো অভিযোগ বহুদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল টালিগঞ্জে।
খুনের চেষ্টা ও শ্লীলতাহানিরও অভিযোগ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তোলাবাজি, অপরাধমূলক ভয় দেখানো, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং খুনের চেষ্টার মতো অভিযোগ। পাশাপাশি বেআইনি অস্ত্র রাখা বা ব্যবহারের অভিযোগে আর্মস অ্যাক্টের ধারাও যুক্ত করা হয়েছে।
ধরা পড়তেই চোর চোর স্লোগান
স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারের পর নিউ আলিপুর থানার সামনে বিক্ষোভও দেখা যায়। এলাকার বহু বাসিন্দা এবং টালিগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মী প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি এবং প্রভাব খাটিয়ে কাজ করা হয়েছে। থানার সামনে ‘চোর চোর’ স্লোগানও শোনা যায়।
বর্তমানে পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে। আরও কেউ অভিযোগ দায়ের করেন কি না, সেই দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই টালিগঞ্জের অন্দরের নানা অজানা তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে স্বরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে এই মামলা আগামী দিনে আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।