টলিউড ইন্ডাস্ট্রির একাংশের ত্রাস! কত না প্রতিভাবান শিল্পীর কেরিয়ার ধ্বংস করেছেন! অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও অন্য কলাকুশলীদের উপরও পড়েছিল কোপ! ইন্ডাস্ট্রিতে স্বৈরাচারী শাসন চালানোর পাশাপাশি তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির মতো মারাত্মক অভিযোগে জর্জরিত। হ্যাঁ, তিনি আর কেউ নন অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস। তাঁর ক্ষমতার আস্ফালনে হাঁসফাঁস করত টলিপাড়ার শিল্পীমহলের একাংশ। বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হতেই একটাই রব, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। স্বরূপের গ্রেফতারির খবর পেয়ে রাতেই থানার সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকাবাসী। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়ে ‘চোর চোর’ স্লোগানে ধিক্কার স্বরূপকে। তাঁর গ্রেপ্তারিতে সরব বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।
স্বরূপ জমানায় একাধিক বাংলা ছবি মুক্তিতে কোপ পড়েছিল। সেই তালিকায় ছিল পরিচালক জয়ব্রত দাসের ‘দ্য অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’। বৃহস্পতিবার স্বরূপের গ্রেপ্তারির পর একের পর ব্যাঙ্গাত্মক পোস্টে জমে থাকা ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন জয়ব্রত। কখনও খোঁচা মেরে লিখেছেন,’আজকে ওয়ার্ল্ড সিনেমা ডে ঘোষণা করা উচিত’ তো কখনও আবার অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষোদাগার, ‘ওনার থেকে বাংলা সিনেমা বানানোর নিয়ম গুলো আর শেখা হলো না। আপশোসটা রয়ে যাবে অনেকদিন।’ উল্লেখ্য, রাজ্যে পালাবদলের পর সরকারি প্রেক্ষাগৃহ নন্দনে মুক্তি পেয়েছে সেই ছবি।
‘বিশ্বাস বাবু’ সম্বোধন করে ঋদ্ধির ব্যাঙ্গাত্মক বাক্যবাণ, ‘দু বছর আগে অবধি ওঁর মুখের আদল কেমন জানতাম না। প্রয়োজন বোধ করি নি জানার শুধু জানতাম যে সুরুচি সংঘের কার্তিকের গোঁফ অনুকরণ করে নাকের নীচে এক জোড়া গাম্ভীর্য লালন করার কাজ যত্ন নিয়ে করতেন। আর ঠিক যখন ব্যস্ত সবাই এদিক ওদিক করছে ঘোরাঘুরি, বাবু হাঁকেন, ”ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি।’
নিজেকে ইন্ডাস্ট্রির ‘রাজা’ মনে করতেন স্বরূপ বিশ্বাস। তাই তো অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘এই সেই ল্যাম্পপোস্ট, যে ওই পাহাড়ের থেকে নিজেকে বেশি লম্বা ভাবে’। স্বরূপ নিধন যেন ফিরিয়ে আনল মহিষাসুর বধের মাহেন্দ্রক্ষণ। তিনি তো রক্তবীজের মতো অসুর! ইন্ডাস্ট্রিকে কলুষিত করেছে স্বরূপের শুম্ভ নিশুম্ভরা। বদলের বঙ্গে অনেকেই নিজেদের রং বদলেছে। স্বরূপের সমসাময়িক যাঁরা একই দোষে দুষ্ট তাঁদের মুখোশ যেদিন খুলবে সেদিনই হবে আসল শাপমোচন।
নিজের পোস্টের মাধ্যমে ঠিক এটাই বোঝাতে চেয়েছেন ইন্ডাস্ট্রির বর্ষীয়ান অভিনেতা সোহান বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘একটা কুমির পিটিয়ে এত লাফাবেননা। একটা খাল বুজিয়েও লাভ নেই। খাল কাটানোর ফন্দীবাজগুলোকে চিহ্নিত করুন, সেই ব্যাটাদের নজরে রাখুন। কাজে দেবে।’
অনেকটা একই সুর অভিনেতা সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখনিতেও। তাঁরও দাবি, ‘ইন্ডাস্ট্রিতে কলুসিত করতে অনেকেই স্বরূপের সঙ্গে কাজ করেছেন। আমি আশা রাখব সেই সকল মানুষের মুখোশ টেনে খোলা হবে। প্রতিটি অন্যায়কারী যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়। সব অপরাধ সবসময় যৌন নির্যাতনই হয় না, মানসিকও হয়।’
অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের মতে, ‘কেউ একদিনে স্বরূপ হয় না। সিস্টেমের গোড়ায় গলদ। স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে একটা লাইন বলার অপরাধে আমার উপর যাঁরা ঝাপিয়ে পড়েছিল আজ এই বিশ্বাসের গ্রেপ্তারের খবরে তারা কি মর্মাহত, নাকি আনন্দিত?’
স্বরূপের গ্রেফতারিতে জীতুর পোস্টে উঠে এসেছে ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর ভয়ের বাণী। অভিনেতা জানাচ্ছেন, ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইতেন। তার নেপথ্যে থাকত একটাই কারণ, ‘এই দেখ আমার সঙ্গে স্বরূপ বিশ্বাস,অরূপ বিশ্বাসের ওঠা-বসা আছেতাই বেশি কথা বারাস না।’ অভিনেতা মৈনাক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খোঁচা, ‘খোকাকে বলে দে এটা বিশ্বাস করতে।’
পরিচালক-চিত্রনাট্যকার পারমিতা মুন্সী স্বরূপের গ্রেপ্তারিতে ইন্ডাস্ট্রির কিছু মানুষের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়েছেন, ‘এযাবৎকালের মৌরসীপাট্টা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে এত বিরোধিতা? এত গেল গেল রব! আগের জন খারাপ, পরেরজনকে নিয়েও অসুবিধা? এবার তো স্বর্গ থেকে দেবতাকে নেমে আসতে হবে টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা সমাধানে।’
ক্ষমতার প্রভাব আর সাফল্যের অন্ধকারে অন্ধ হলে কী হয় আরও একবার সেই কথা মনে করিয়ে দিলেন অভিনেত্রী রূপালি রাই ভট্টাচার্য।