• মিলেমিশে গেল মন-রাজনীতির অলিগলি, কেমন হল ‘গোর্কির মা’
    আজকাল | ০৫ জুন ২০২৬
  • সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ইদানীং দর্শক মহলে বেশ জনপ্রিয় ঘরানা। মনের অলিগলি বেয়ে রহস্যের জট খুলতে দেখা বেশ নেশা ধরিয়ে ছাড়ে। আর তাতে যদি মিলেমিশে যায় রাজনীতির উত্তাপ, তবে তো সোনায় সোহাগা। সেই অঙ্কের হিসেব মানলে ‘গোর্কির মা’-এর মন কাড়ার কথাই ছিল। কিন্তু পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্য বরাবরই চমকে দেন তাঁর ভাবনার গভীরতায়। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ফ্রাইডে-তে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া এ সিরিজও তার ব্যতিক্রম হল না। একদিকে এক মায়ের মনের গহীনে অনুভূতির দোলাচল, ছাত্র রাজনীতির ছোঁয়াচে উন্মাদনা ও অপরাধের জট—সবটাকে নিখুঁত হাতে মিলিয়ে দেওয়া এবং অন্যদিকে বলিষ্ঠ অভিনয় একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠে যেন অন্য রকম এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেল ‘গোর্কির মা’-কে।

    কালজয়ী রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস ‘মাদার’-এর অলিগলি ছুঁয়ে সিরিজের গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন দেবালয়। উপন্যাসের পাভেল আর তার মা নিলোভনার কাহিনিকে, তাদের সম্পর্কের রসায়নকে ফিরে দেখতে চেয়েছেন এখনকার ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপটে। সিরিজের গল্পে লাবণ্য (অনন্যা চট্টোপাধ্যায়) নিজের কলেজজীবনে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। সেই শুরু। সেই থেকে বিপ্লবের আগুন তার বুকের ভিতর ধিকিধিকি জ্বলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সাহস বয় শিরায় শিরায়। সেই বিপ্লবচেতনা থেকে, সেই উন্মাদনা থেকে তার আর বেরিয়ে আসা হয় না কোনওদিনই। আর তাই প্রবল পুরুষতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী স্বামীকে এককথায় পিছনে ফেলে আসতে, জেলের গরাদের ওপারে সন্তানের জন্ম দিতে পিছপা হয়না লাবণ্য। একার লড়াই লড়ে নিজের বিশ্বাসে, বিপ্লবচেতনায় বড় করে তোলে ছেলে গোর্কিকে (সোহম বসু মজুমদার)। ম্যাক্সিম গোর্কির ভাবধারার, তাঁর উপন্যাসের অন্ধ ভক্ত লাবণ্য স্বপ্ন দেখে, গোর্কিও একদিন পাভেলের মতো বুকের ভিতর জ্বালিয়ে নেবে বিপ্লবের আগুন। কিন্তু ছেলে বড় হয়ে কলেজে পা দেওয়ার পরে মা অবাক হয়ে দেখে মানুষের অধিকার নয়, ক্রমশ ব্যক্তিস্বার্থই বড় হয়ে উঠছে গোর্কির কাছে। ছাত্র রাজনীতির তপ্ত ময়দানে পা রেখেও সে অঙ্ক কষছে নিজের ভবিষ্যতের।

    সিরিজের শুরু এক রাতে। ছ’টি পর্বে গল্প এগিয়েছে সেই একটিমাত্র রাতের ঘটনাক্রম ঘিরেই। কলকাতার কলেজে ছেলেকে পড়তে পাঠিয়ে পঙ্গু লাবণ্য এখন একাই থাকে বাড়িতে। বিরাট সেই পুরনো বাড়িটার উপর অনেকদিনই চোখ পড়েছে স্থানীয় প্রোমোটার টুটুর। বাড়ি দখল করতে লাবণ্যকে ভয় দেখিয়ে বিক্রির কাগজে সই করিয়ে নেওয়ার ভার সে দেয় মানিককে (সৌরভ দাস)। সদ্য রিয়াকে (দর্শনা বণিক) বিয়ে করে অভাবের সংসারটাকে গুছিয়ে নিতে চাওয়া মানিক এ কাজে রাজি হয় সামান্য ক’টা টাকার জন্য। সেই রাতে ভাড়াটে গুন্ডা হয়ে লাবণ্যর বাড়িতে পা রাখলেও মনের ভিতরে নিষ্ঠুরতাকে সে কোনওভাবেই জাগিয়ে তুলতে পারেনি। ভেবেছিল নরমে গরমে বুঝিয়েসুঝিয়ে কাজ সেরে রাতেই বৌকে নিয়ে চলে যাবে হানিমুনে। সেখান থেকেই নতুন করে গড়ে নেবে জীবনটাকে। কিন্তু বাদ সাধল গোর্কি। মানিকের সঙ্গে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি করতে গিয়ে আচমকাই দেওয়ালের পেরেক মাথায় গেঁথে গিয়ে মৃত্যু হল তার। চোখের সামনে গোর্কির এমন পরিণতিতে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে মানিক। আকস্মিক এই আঘাতে টালমাটাল হয়ে পড়া লাবণ্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে সে শাস্তির প্রতীক্ষায় থাকে। এবার কী করবে সন্তানহারা লাবণ্য? প্রতিশোধের আগুনে ঝলসে দেবে মানিক আর টুটুকে? রিয়াকে নিয়ে আগামীর স্বপ্ন কি তবে অধরাই থেকে যাবে মানিকের? নাকি লাবণ্যের ক্ষমা তাকে আর একটা সুযোগ দেবে নতুন করে বাঁচার? এক রাতে বদলে যাওয়া দু’দুটো জীবনের অচেনা সমীকরণেই এগিয়েছে সিরিজের গল্প। বিপ্লব চেতনার সঙ্গে ছাপোষা মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব কবেই বা আর এক সরলেরেখায় হেঁটেছে?

    সেই দোলাচলকে, মাতৃস্নেহের সঙ্গে পদে পদে রাজনীতির ময়দানের উত্তাপ-উন্মাদনার লড়াইকে লাবণ্যর মধ্যে প্রতিটা মুহূর্তে জীবন্ত করে তুলেছেন অনন্যা। তারই বিপ্রতীপে মায়ের স্বপ্নপূরণ এবং নিজের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাওয়ার টানাপোড়েনে ধস্ত গোর্কির অনুভূতিগুলোকে যত্ন করে বুনেছেন সোহমও। মা-ছেলের চেনা রসায়নের বাইরে এই অন্যরকম পথচলা, গোর্কিকে আচমকা হারিয়ে লাবণ্যর স্তব্ধতা দর্শককে কখনও অস্থির করে তোলে, কখনও বা বুকের ভিতর জাগিয়ে দেয় দমচাপা এক অনুভূতি। অন্যদিকে এক আদ্যোন্ত সাধারণ জীবনে বিশ্বাসী মানিকের অনিচ্ছাসত্ত্বেও লাবণ্যকে ভয় দেখাতে আসা, গোর্কির মৃত্যুতে কুরে কুরে খাওয়া অপরাধবোধ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে প্রতি মুহূর্তে সহানুভূতি আদায় করে ছাড়েন সৌরভও। পর্দার ‘মন্টু পাইলট’-এর একশো আশি ডিগ্রি উল্টো পিঠের এই অভিনয় তাঁর জাত চিনিয়ে দেয়। সংক্ষিপ্ত পরিসরে সদ্যবিবাহিত রিয়াকে, তার আবেগ-অনুভূতিগুলোকে ভারী মিষ্টি লাগে দর্শনার অভিনয়ে। বাস্তবের দম্পতির রসায়ন ধরা দেয় তাঁদের পর্দার দাম্পত্যের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে। লাবণ্যের কমবয়সী চরিত্রে বেশ ভাল লাগে রাজেশ্বরী পালকে। মন ছুঁয়ে যায় গোর্কির দুই বন্ধু, ছাত্র রাজনীতির উত্তাপ মাখা দুই কলেজপড়ুয়া ব্রতী ও সাহানাও।

    প্রায় গোটা সিরিজটাই এক সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির চার দেওয়ালে বন্দি। তার ভিতরেই তার যাবতীয় দোলাচল, টানাপোড়েন। টিমটিমে আলো, আধো অন্ধকারে লাবণ্য-মানিকের চাপানউতোর, গোর্কির পরিণতি এবং তারপর সন্তানহারা মা ও এক অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ঘটিয়ে ফেলা সাধারণ এক যুবকের সামনে পড়ে থাকা আস্ত একটা রাত-- দেখতে দেখতে কখনও মনে হতে পারে সিরিজের গতি যেন থমকে গিয়েছে। কখনও বা মনের ভিতর দলা পাকিয়ে ওঠে অস্বস্তি। লাবণ্যর স্তব্ধতা মনের গভীরে গিয়ে নাড়া দিয়ে আসে, তৈরি করে দেয় অস্থিরতা। সেটাই এ সিরিজের শক্তি, যার হাত ধরে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে ‘গোর্কির মা’। এক কথায় বলা চলে, একেবারে অন্য স্বাদে বোনা তার অসাধারণত্ব। চেনা ছকের থ্রিলার, রহস্যভেদের রুদ্ধশ্বাস প্লট, দুর্দম গতি আশা করলে অবশ্য অন্য কথা।
  • Link to this news (আজকাল)