এই সময়, উলুবেড়িয়া: শুধুমাত্র বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেই দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল বিধায়কদের কোনও ভাবেই রেয়াত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন বিজেপি নেতৃত্ব। হাওড়া জেলার একাধিক বিজেপি নেতা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, বিদ্রোহী সেজে অনেক তৃণমূল নেতা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে চাইছেন, যাতে তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা না নেয়। কিন্তু তাতে সরাসরি জল ঢেলে দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, যাঁরা এতদিন দুর্নীতি করেছেন, তাঁদেরকে আইনের কাঠগড়ায় তোলা হবে। বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিলেও তাঁরা পার পাবেন না।
উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে হাওড়া জেলার একাধিক তৃণমূল বিধায়ক ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বাগনানের অরুণাভ সেন (রাজা), পাঁচলার গুলশান মল্লিক, উদয়নারায়ণপুরের সমীর পাঁজা, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি, সাঁকরাইলের প্রিয়া পাল, মধ্য হাওড়ার অরূপ রায় এবং হাওড়া দক্ষিণের নন্দিতা চৌধুরী। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগ উঠেছে। কারও কারও বিরুদ্ধে থানায় এফআইআরও হয়েছে। কেউ আবার জনরোষের ভয়ে এলাকাছাড়া। বিজেপি নেতাদের দাবি, বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখানোর পরে তাঁদেরই কেউ কেউ বাল্মিকী হতে চাইছেন। পুলিশের লোকেরাও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিছপা হচ্ছেন। এ নিয়ে যারপরনাই ক্ষুব্ধ বিজেপি নেতারা।
হাওড়ার পাঁচলা থেকে এ বার জয়ী হয়েছেন তৃণমূলের গুলশান মল্লিক। কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। জোর করে জমি দখল, কারখানার মালিকদের কাছ থেকে তোলা আদায়–সহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বেশ কয়েকজন অনুগামীকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ। জনরোষের ভয়ে তিনি নিজেও এলাকাছাড়া। এই অবস্থায় গুলশান বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ায় উৎফুল্ল তাঁর সমর্থকরা। এতে বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছেন বিজেপি নেতারা। পাঁচলার পরাজিত বিজেপি প্রার্থী রঞ্জন পাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে গুলশান মল্লিক এবং তাঁর দলবল সাধারণ মানুষের উপরে বহু অত্যাচার করেছেন। বহু লোকের জমি দখল করেছেন। জোর করে অন্যের জমিতে মাটি ফেলে ভরাট করেছেন। কারখানার মালিকদের কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়েছেন। বহু বিজেপি সমর্থক ওনার ছেলেদের হাত মার খেয়েছেন। এখন বিদ্রোহী সাজলেও যে অন্যায় উনি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই তদন্ত হবেই। কিছুতেই উনি পার পাবেন না। যে শিবিরেই যাক না কেন, কৃতকর্মের ফল ওনাকে ভোগ করতে হবে।’
উদয়নারায়ণপুরের বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক সমীর পাঁজার বিরুদ্ধেও তোপ দেগেছেন বিজেপির পরাজিত প্রার্থী প্রভাকর পণ্ডিত। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকার সময় সমীর পাঁজা ও তাঁর দলের কয়েকজন গুণ্ডা আমাদের কর্মী–সমর্থকদের উপরে অনেক অত্যাচার করেছেন। তার জন্য অনেক বিজেপি কর্মীকে দীর্ঘদিন ঘরছাড়া থাকতে হয়েছে। তা নিয়ে সমীর পাঁজার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। তিনি যেখানেই যান না কেন, শাস্তি তাঁকে পেতেই হবে।’
বাগানানের বিজেপির পরাজিত প্রার্থী প্রেমাংশু রাণাও সুর চড়িয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখানো স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক রাজা সেনের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, বিধানসভা ভোটের আগে রাজা সেন প্রকাশ্য সভায় বিজেপির কর্মীদের মারধরের হুমকি দিয়েছিলেন। রাজা সেন ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী অনেক জায়গায় তোলা তুলতেন। তা নিয়ে প্রেমাংশু থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। প্রেমাংশুর কটাক্ষ, ‘বাগনানের বিধায়ক ভেবেছেন ঋতব্রতকে সমর্থন করে বেঁচে যাবেন। তবে সে গুড়ে বালি। ওটা কিছুতেই হবে না।’
দলীয় লাইনের বাইরে বেরিয়ে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থনের পিছনে পাঁচলার তৃণমূল বিধায়ক গুলশান মল্লিকের যুক্তি, ‘ভোটের পরে দলীয় কর্মীরা রোজ অত্যাচারিত হচ্ছেন। তাঁদের নামে মিথ্যা মামলা হচ্ছে। রাজ্য স্তরের নেতারা তাঁদের কোনও খোঁজখবর নিচ্ছিলেন না। তাই আমরা বাধ্য হয়ে ঋতব্রতকে সমর্থন করেছি।’
বাগনানের তৃণমূল বিধায়ক অরুনাভ সেন বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সবার নেত্রী। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদার সুলভ আচার আচরণ করতেন, যা আমাদের কর্মীদের পছন্দ নয়। ভোটের পরে আমার বিরুদ্ধে এবং আমার অনেক সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বিজেপি অনেক মিথ্যা মামলা করেছে।’