• কাজ ‘শূন্য’ অথচ খাতায়-কলমে...! সাহেবনগরের সরকারি স্কুলের কাজে বড় দুর্নীতির গন্ধ, সরব গ্রামবাসীরা
    News18 বাংলা | ০৫ জুন ২০২৬
  • : কাজ হয়নি এক টাকারও, অথচ স্কুলে ফলক টাঙ্গানো থাকায় গ্রামবাসীদের অভিযোগ, খাতায়-কলমে উঠে গেছে সরকারি প্রকল্পের লক্ষ লক্ষ টাকা! মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী ব্লকের সাহেবনগর অঞ্চলের ১৬ নং খাসমহল প্রাইমারি স্কুলে এই বেনজির দুর্নীতির অভিযোগ তুলে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। দুর্নীতি ঢাকতে প্রকল্পের সরকারি ফলক কাদা দিয়ে লেপে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে, যা নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজ্য সরকারের ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্পে ওই স্কুলের সীমানা প্রাচীর তৈরি এবং ‘সজল ধারা’ প্রকল্পে পানীয় জলের কল সংস্কারের জন্য মোট ৪ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭১৬ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। এর মধ্যে দেওয়াল তৈরির জন্য ২ লক্ষ ৫৯ হাজার ৩৫৫ টাকা এবং জলের কল সংস্কারের জন্য ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ৩৬১ টাকা ধার্য হয়। নিয়ম মেনে স্কুলেই কাজের খরচের খতিয়ান সংবলিত একটি বোর্ড বা ফলকও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বাস্তবে কোনও কাজই করা হয়নি। উল্টে জালিয়াতি আড়াল করতে রাতের অন্ধকারে সেই সরকারি বোর্ডের উপর কাদা লেপে লেখা মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, কাজ না করেই ঠিকাদার সংস্থা অবৈধভাবে পুরো বিলের টাকা তুলে নিয়ে চম্পট দিয়েছে। ​এই ঘটনার পিছনে ইট গায়েবের এক রহস্যময় গল্পও উঠে এসেছে। গ্রামবাসীদের দাবি, বিধানসভা ভোটের আগে স্কুলের দেওয়াল তৈরির নাম করে প্রায় দেড় হাজার ইট এনে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু ভোট ঘোষণা হতেই রহস্যজনকভাবে সেই ইট সরিয়ে ফেলা হয়।

    স্কুলের প্রধান শিক্ষক গৌতম বিশ্বাস জানান, ভোটের সময় পঞ্চায়েত সমিতির সদস্যের উপস্থিতিতেই ইট সরানো হয়েছিল। যার মধ্যে ৭৫০টি ইট পাশের একটি মন্দিরের পিছনে রাখা থাকলেও, বাকি ৭৫০টি ইটের কোনও হদিস নেই। ঠিকাদার সংস্থাই সেই ইট তুলে নিয়ে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এদিকে কাজ শুরুর আগেই কেন ফলক লাগানো হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ঠিকাদার সংস্থা স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানায় যে ‘জিও ট্যাগ’ করার জন্য ওটি লাগানো হয়েছে। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক বিডিও অফিসের ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে জানানো হয়, আপাতত ফান্ডের টাকা বা ‘আপাস’-এর টাকা পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কাজ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু ভোট মেটার পর প্রধান শিক্ষক ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য বিডিও অফিসে গেলে তাঁদের মনে হয়, এই কাজের ফান্ড আগামী দিনে আদৌ আসবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ এটি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী হওয়া কাজ, জেলা পরিষদ বা পঞ্চায়েত অফিসের ফান্ড নয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ফান্ডের সঙ্গে স্কুলের সরাসরি কোনও আর্থিক লেনদেন বা যোগাযোগ নেই।

    এই চরম দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাহেবনগর অঞ্চলের পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য সুমন্ত সরকার এবং স্থানীয় বাসিন্দা সন্দীপ কুমার বিশ্বাস সহ সমগ্র গ্রামবাসী। পঞ্চায়েত সমিতির মেম্বার সুমন্ত সরকারের জানান,​ “এই স্কুলে ফলক টাঙ্গানো হয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি। তার জন্যই আমরা জানতে চাইছি আদৌ এই কাজটা না করার পরেও কেন ফলক লাগানো হল এবং যদি ফলক লাগানো হয়ে থাকে তাহলে সেই কাজ না করে কি বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সেই দোষীদের শাস্তি দাবি করছি। এখানে এক গাড়ি ইট ফেলা হয়েছিল এবং সজল ধারা প্রকল্পে জলের কল সংস্কারের কোও কাজ হয়নি এবং স্কুলের প্রাচীর দেওয়া হয়নি, কিন্তু তার মধ্যে এক টলি ইট একসময় তুলে নেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে আমরা সবাই মিলে চাইছি এখানে প্রাচীর এবং জলের কাজটা যেন আবার করা হয়।”

    স্থানীয় বাসিন্দা সন্দীপ কুমার বিশ্বাস জানান, এখানে স্কুলে একটি ফলক লাগানো হয়েছিল। আমাদের পাড়া আমাদের সমাধানের প্রকল্পে যে ফলকে সজল ধারা প্রকল্পের টাকার ধার্য করা হয়েছে কিন্তু জলের কল সংস্কারের কোনও কাজ করা হয়নি। পাশাপাশি এখানে স্কুলের প্রাচীর করার জন্য এক গাড়ি ইট পড়েছিল। সেই ইটের মধ্যে এক টলি ইট এখান থেকে তুলে নেওয়া হয় ঠিকাদার সংস্থার পক্ষ থেকে মনে হচ্ছে। কাজ না করেই এই ফলক টাঙিয়ে দিয়ে কোন রকম ভাবে অবৈধভাবে বিল তুলে নেয়া হয়েছে বলে মনে করছি। এর সঠিক তদন্ত করা হোক সরকারিভাবে এবং পুনরায় এই কাজটি হয় আমরা সেটাই চাই। জলঙ্গী ব্লকের বিডিও জয় আহমেদ জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। সরকারি টাকার অপচয় বা দুর্নীতি কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
  • Link to this news (News18 বাংলা)