‘ভাই, আমাকে বাঁচা। এখানে প্রচুর ধোঁয়া, আমি শ্বাস নিতে পারছি না’— বুধবার ভোরে ফোন তুলে বন্ধুর এমনই আর্তচিৎকার শুনেছিলেন আমান সিং। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। কেউ সেকেন্ডের মধ্যেই কেটে যায় ফোন। বন্ধু শ্রুতিকার সাহায্যে তিনি কিছু করার আগেই সব শেষ। দিল্লির মালব্য নগরের হাউজ রানি এলাকার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের তালিকায় নাম রয়েছে আমানের বন্ধু ২৫ বছর বয়সি শ্রুতিকা বারানওয়ালের (Shrutika Baranwal)।
জানা গিয়েছে, ঝাড়খণ্ডের বোকারোর বাসিন্দা শ্রুতিকা সম্প্রতি মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS) থেকে ওয়াটার পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পড়া শেষ করেছিলেন। পেয়ে গিয়েছিলেন চাকরিও। সেই নিয়ে পরিবারের লোকজন ও বন্ধুদের মধ্যে আনন্দের সীমা ছিল না। দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রথম চাকরিতে যোগ দিতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন শ্রুতিকা। স্বপ্নপূরণের স্বাদ পেতে না পেতেই তাঁর জীবন থেমে গেল। অভিশপ্ত ফ্লারিশ স্টে হোটেলে থাকাটাই হলো কাল। ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে শ্রুতিকার।
পরিবার ও বন্ধুদের সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্রুতিকা সম্প্রতি রাবার, কেমিক্যাল অ্যান্ড পলিমার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলে চাকরি পেয়েছিলেন। নতুন চাকরির আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিনি দিল্লিতে এসেছিলেন। কাজের সূত্রে এক রাতের জন্য তিনি ‘ফ্লারিশ স্টে’ নামের ওই হোটেলে উঠেছিলেন। ঘটনার দিন সকালেই তাঁর চেক-আউট করার কথা ছিল এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুম্বই ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
বন্ধুদের বর্ণনা অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের ঠিক আগে শ্রুতিকা ফোনে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনাও করেছিলেন। হঠাৎ ফোনের ওপার থেকে চিৎকার শোনা যায়— ‘হেল্প, হেল্প, আগুন!’ এর পরেই তিনি তাঁর অন্য বন্ধু আমানকেও সাহায্যের জন্য ফোন করেন। তার পরেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বন্ধুরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শ্রুতিকার সেই আর্তচিৎকার এখনও কানে বাজছে আমানের।
শ্রুতিকার সহপাঠী ও শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত মেধাবী, প্রাণবন্ত এবং সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্নে বিশ্বাসী ছিলেন। ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণ এবং জলনীতি সংক্রান্ত গবেষণায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। TISS-এ পড়াকালীন তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁর গবেষণার প্রশংসা করেছিলেন শিক্ষকরাও।
শ্রুতিকার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে টিস ক্যাম্পাসে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শোকসভা আয়োজন করে তাঁকে স্মরণ করেছে। পরিবারের সদস্যদের কথায়, চাকরি পাওয়ার পরে নিজের প্রথম বেতন হাতে পেয়ে তিনি খুব খুশি ছিলেন এবং বাবার সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মজীবনের স্বপ্ন পূরণের আগেই দিল্লির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সেই স্বপ্ন চিরতরে থামিয়ে দিল।