• ‘চেয়ারের মর্যাদা রাখতে পারিনি’, কলকাতা পুরসভার মেয়দ পদ থেকে ইস্তফা ফিরহাদের
    এই সময় | ০৫ জুন ২০২৬
  • পুরোনো দিনের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লেন ফিরহাদ হাকিম। কখনও আবার কখনও তাঁর গলা থেকে ঝরে পড়ল আক্ষেপ। শুক্রবার দুপুরে কলকাতা পুরসভায় পৌঁছন ফিরহাদ হাকিম। অবশ্য তার আগে থেকেই তাঁর ইস্তফার খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা রাজ্যে। বিকেল ৪টে নাগাদ সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজেই সেই ঘোষণা করলেন তিনি। ফিরহাদ বললেন, ‘চেয়ারের মর্যাদা রাখতে পারছিলাম না।’ নেতাজিকে সম্মান জানাতে পারেননি বলে আক্ষেপও করলেন তিনি।

    ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রথম বার মেয়র হন ফিরহাদ। তার পর থেকে প্রায় সাড়ে সাত বছর মহানাগরিকের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। এ দিন বিকেলে প্রথমে সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে মেয়র হিসেবে তিনি কী করেছেন, কী করতে পারেননি বিস্তারিত জানান। তার পরে জানান, তাঁর ইস্তফার কারণ। সাংবাদিক বৈঠক শেষে চেয়ারপার্সন মালা রায়ের ঘরে যান ফিরহাদ। সেখানে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। ৩ জন বরো চেয়ারম্যানের পর মহানাগরিক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ। ফিরহাদ-হীন পুরসভা কী ভাবে চলবে? এই প্রশ্নের উত্তরে পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডে বলে দেন, ‘পুরো প্রস্তুত।’

    পুরসভার মেয়র পদে কোভিড সামলানোই তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে জানালেন ফিরহাদ। তিনি বলেন, ‘বেআইনি নির্মাণ রুখতে পদক্ষেপ করেছি। নিকাশি সমস্যার সমাধান করেছি অনেকটাই। তবে মেয়র পদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কোভিড সামলানো। আমফানও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেটাও আমরা দক্ষ হাতে সামলে দিয়েছিলাম।’ আক্ষেপের কথা বলতে গিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রসঙ্গ টেনে আনলেন ফিরহাদ। ১৯৩০ সালে কলকাতার মেয়র হয়েছিলেন নেতাজি। ফিরহাদের কথায়, ‘একবার ঠনঠনিয়ায় জল জমেছিল। পরিস্থিতি দেখতে নেতাজি কোমর সমান জলে গামবুট পরে হেঁটে হেঁটে ঠনঠনিয়ায় গিয়েছিলেন। তাঁকে সম্মান জানানোর ইচ্ছা ছিল, হলো না।’

    ইস্তফা দেওয়ার কারণ জানাতে গিয়ে নিজেকে ‘নিধিরাম সর্দারের’ সঙ্গে তুলনা করেন তিনি। ফিরহাদের কথায়, ‘আমি মেয়র ছিলাম, আবার পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রীও। ফলে এখানে যা পাশ হয়েছে, তা ওখান থেকে স্যাংশন করিয়ে আনতে কোনও অসুবিধা হয়নি। এখন সেটা হচ্ছে না।’ এক সময় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন রায়রা কলকাতার মহানাগরিকের দায়িত্ব সামলেছেন। ফিরহাদ বললেন, ‘আমি তাঁদের চেয়ারে বসব কোনও দিন ভাবিনি। রাতে তাঁদের কথা ভাবলে গায়ে কাঁটা দিত। আজও তাঁদের প্রণাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। সেই চেয়ার আঁকড়ে থাকতে চাইনি।’

    অবশ্য ফিরহাদ যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে মেয়াদ শেষের আগেই ইস্তফা দেওয়ার কোনও কারণ জানাননি তিনি। শুধু লিখেছেন, ‘১৯৮০-র কেএমসি আইন কলকাতার মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করছি। এই ইস্তফা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ এর পরে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান তিনি। ফিরহাদ লিখেছেন, ‘কলকাতার মানুষের সেবা করার সুযোগ পাওয়াটা অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের বিষয়। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আপনার, মেয়র-ইন-কাউন্সিলের সদস্যদের এবং সমস্ত কাউন্সিলারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা, সমর্থন ও পরামর্শ পেয়েছি, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’

    উল্লেখ্য, ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে কলকাতা পুরসভার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। ২০০০, ২০০৫ এবং ২০১০ সালে টানা তিন বার তৃণমূলের টিকিটে কাউন্সিলার হয়েছেন। তবে ২০১৫-য় প্রার্থী হননি। সেই বছর ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে জয়ী হন তৃণমূলের প্রণব বিশ্বাস। ২০১৮ সালে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের পদত্যাগের পর কলকাতার মেয়রের দায়িত্ব পান ফিরহাদ। মেয়র পদে বসার পর উপনির্বাচনে আবারও ৮২ নম্বর ওয়ার্ড থেকেই কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে পুরসভায় ফিরে আসেন তিনি। এরপর ২০২১ সালের পুরভোটেও একই ওয়ার্ড থেকে জেতেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।

  • Link to this news (এই সময়)