• হকারের 'হকের' কথা বলবে কে!
    আজকাল | ০৬ জুন ২০২৬
  • বিউ সরকার: হাওড়া শিয়ালদহ স্টেশনের পর দমদম স্টেশনেও হকার উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এইভাবে সবটা শেষ হয়ে যাবে ভাবতে পারেননি দমদম স্টেশনে ঢোকার মুখের রাস্তা থেকে প্ল্যাটফর্মের হকাররা। 

    গত ২৯শে মে শনিবার হঠাৎ মধ্যরাতেই দমদম স্টেশন থেকে প্ল্যাটফর্মের বেআইনি দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। ৩০ শে মে রবিবার সকালে হঠাৎ দোকানে এসে দেখতে পেলেন সাধের রুজি রোজগারের দোকান ভেঙে চুরমার। আম্ফান-ইয়াসের মতো ঝড় গিয়েছে, তবুও এভাবে কোনও দোকান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়নি কোনওদিন বলেই জানাচ্ছেন দমদম স্টেশনের পাশে থাকা হকাররা।

    অস্থায়ী কাঠামো কোথাও আস্ত ছিল না। ছ'দিন পার হয়ে গিয়েছে তবুও এখনও সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি তাঁরা। কী করবেন কীভাবে রুজি-রোজগার করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না কেউ। কেউ কেউ ভিক্ষা করছেন। কেউ কেউ আবার স্টেশনের পাশের রাস্তাতেই বসে চা মোমো, চিলি চিকেন ফ্রাইড রাইস চশমা ব্যাগ বিক্রি করছেন। প্রাণে ভয় রয়েছে কখন আরপিএফ এসে তাঁদেরকে সরে যেতে বলে। এমনকী ইতিমধ্যেই তাঁদেরকে সরে যেতে বলা হয়েছে, এমনটাই জানান অর্চনা ভট্টাচার্য নামে এক চা বিক্রেতা। 

    তাহেরপুর থেকে আসেন। ৩৫ বছর ধরে দমদম স্টেশনের পাশে চা, বিস্কুট বিক্রি করতেন। নিত্যযাত্রীরা আসতেন। তাঁর কাছ থেকে অফিসে যাওয়ার সময় চা খেতেন। এখন তিনি বসছেন স্টেশনের পাশে রাস্তাতেই দুটি ফ্লাক্সে করে, কিন্তু ভয় প্রাণে। কখন আরপিএফ এসে তাঁদেরকে উঠিয়ে দেয়।

    এখন তাঁর সংসার কীভাবে চলবে বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। তিনি জানিয়েছেন, ভাড়া দিতেও রাজি আছেন। অর্চনা জানিয়েছেন, "আমরা ভরসা করেছিলাম এই সরকারের উপর আশা করি তারাও আমাদের পাশে থাকবে আমাদের একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেবে।" জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। 

    আবার, ৭৪ বছরের এক বৃদ্ধা সরস্বতী মল্লিক ও তাঁর মেয়ে বিক্রি করতেন ফল। বয়সের ভারে বেশিরভাগ সময় তাঁর মেয়েই ফল বিক্রি করতেন। এখন উচ্ছেদের জেরে ওষুধের খরচ কোথা থেকে আসবে, বলতে বলতে বৃদ্ধা কেঁদে ফেলেন। 

    গোবরডাঙ্গার সন্তোষ দাস নামে এক ফুল ব্যবসায়ী। তাঁর মাসের ওষুধের খরচ প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার। এই টানাপোড়েনে এখন তিনি ভিক্ষা করছেন দমদম স্টেশনে বসেই। বৃদ্ধ বয়সে কোথায় যাবেন? কী খাবেন? ভাবতে ভাবতে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

    ৩০ বছর ধরে দমদম স্টেশনে ঢোকার মুখে ফুল বিক্রি করেন। দুই সন্তান রয়েছে। মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে ও ছেলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। ফুল বিক্রি করেই তাঁর সংসার চলে। তিনি জানিয়েছেন, ছেলে মেয়েদের পড়ার খরচ কী করে চালাবেন বুঝতে পারছেন না। ৬দিন হয়ে গেল তাঁর কোনওরকম রোজগার নেই। তবুও প্রত্যেকদিন গোবরডাঙ্গা থেকে দমদমে আসছেন। সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফের রাতেই ফিরে খাওয়া। সারাদিন শুধুমাত্র চা খেয়েই দিন কাটছে তাঁর। ভাবতে হচ্ছে ছেলেমেয়েদের কথা, পরিবারের কথা। ছেলে মেয়েকে কী করে পড়াবেন, কোথা থেকে রোজকার করবেন, সেটাই ভাবছেন তিনি। কারণ, এখনও পর্যন্ত তাঁরা কোথায় যাবেন কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না।

    অন্যদিকে, দমদম স্টেশনের ব্যস্ততার মাঝে কান পাতলেই শোনা যেত বাঁশির এক মনোরম সুর। পায়জামা ও ফতুয়া পড়ে দমদম স্টেশনের বাইরে বর্ধমানের অনিল বিশ্বাস তিনি বাঁশি বাজান। নানান ধরনের বাঁশি তাঁর কাছে রয়েছে। এটাই তাঁর পেশা এটাই তাঁর নেশা। তাঁর বাঁশির সেই সুর শুনতে শুনতে কেউ এগিয়ে যান গন্তব্যের দিকে, কেউ আবার স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষার মাঝেই বাঁশির সুর উপভোগ করেন যাত্রীরা৷ তিনি জানান, আর হয়তো এই স্টেশনে থাকতে পারবেন না। এখানেই থমকে যাবে তাঁর জীবন। দমদম মেট্রো হওয়ার পর থেকে এখানেই তাঁর ঠিকানা। 

    জানা গিয়েছে, এই দমদম স্টেশন থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিয়ে বাড়ির জন্য ডাক পান তিনি। সকলে জানতেন এটাই তাঁর ঠিকানা। এখন প্রশ্ন, তাহলে এবার কী হবে? কারণ হকার উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে বাঁশিওয়ালা অনিল বিশ্বাসকেও সরে যেতে বলা হয়েছে। তিনি এবার কোথায় যাবেন? চিন্তাতে রয়েছেন বৃদ্ধ।

    বর্তমানে সকলেই চাইছেন পুনর্বাসন অথবা তাঁদের একটি স্থায়ী দোকান এর ব্যবস্থা যদি নতুন রাজ্য সরকার করে।
  • Link to this news (আজকাল)