• মমতা বলেছিলেন মাওবাদী, তৃণমূলের পতন 'সিনেমার মতো' লাগছে সেই তানিয়ার
    eTV Bharat | ০৫ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 5 জুন: আজ থেকে 14 বছর আগে একটি একুশ বছরের কলেজ পড়ুয়ার নিষ্পাপ প্রশ্ন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর ইন্টারভিউ-এর চেয়ার ছেড়ে উঠে যেতে বাধ্য করেছিল ৷ তারপর পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় দেড় দশক ৷ সেই কলেজ পড়ুয়া আজ লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স থেকে জেন্ডার ডেভেলাপমেন্ট অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন-এ এমএস করে ফিরে এসেছেন। তবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর দল তৃণমল কংগ্রেস বাংলার রাজনীতিতে এখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। তৃণমূল সরকারের শুরুর ঔদ্ধত্য দেখেছিলেন তিনি, 14 বছর পর কলকাতায় ফিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর তৃণমল কংগ্রেসকে গেরুয়া ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যেতেও দেখলেন ৷ মুখ্যমন্ত্রিত্বের শুরুতে মমতা যাঁকে 'সিপিএম ক্যাডার', 'মাওবাদী' বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি তানিয়া ভরদ্বাজ, প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী৷

    তখন তানিয়া প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ পাশ করেছেন সব। তাঁর তখন মনপ্রাণজুড়ে বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। এহেন সময় তিনিও অন্যান্য পড়ুয়াদের মতো পৌঁছে গিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে খোলা মনে প্রশ্ন করবেন বলে। কিন্তু, তাঁর ওই একটি প্রশ্ন সেদিন দেশের সবক'টি খবরের কাগজ থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে হেডলাইন তৈরি করে দিয়েছিল । কারণ, তাঁর এক প্রশ্নই প্রবল বিচলিত করেছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে ৷ মমতা তাঁর প্রশ্ন শুনে তাঁকে সিপিএম ক্যাডার এবং মাওবাদী স্টুডেন্টের তকমা দিয়েছিলেন। ইন্টারভিউ চলাকালীন মাঝপথে তিনি তাঁর মাইক ছুড়ে ফেলে বেরিয়ে যান।

    2026 সাক্ষী রইল রাজ্যের এমন কিছু পালাবদলের, যা রাজনৈতিক ইতিহাসে অভূতপূর্ব। দেড় দশকে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকে একেবারে উল্টে দিয়ে স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার বাংলায় সরকার গঠন করেছে বিজেপি। গত 9 মে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ অন্যান্য বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শুভেন্দু অধিকারী। ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলকে ঠিক কীভাবে দেখছেন সেই তানিয়া ভরদ্বাজ ? সেই বিষয়ে কথা বলতে মুখোমুখি হয়েছিলেন ইটিভি ভারতের ক্যামেরার সামনে।

    সাধারণ মানুষের হাত থেকে এখনও ভোটের কালি ওঠেনি, কিন্তু নতুন সরকারের এক মাস যেতে না-যেতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস ৷ এই নিয়ে তানিয়া ভরদ্বাজ বলেন, "এক মাস আগে পর্যন্ত কেউ এটা চিন্তাও করতে পারেনি যে, এত বছরের একটা রাজনৈতিক দল এভাবে ভেঙে যেতে পারে ৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন অভিজ্ঞ মহিলা রাজনৈতিক নেত্রীর এবং তাঁর দলের যে এই পরিস্থিতি হবে, সেটা দেখে সত্যিই অবাক লাগছে ৷ আমরা বসে সবাই একটা শো দেখছি বলে মনে হচ্ছে ৷ প্রত্যেক ঘণ্টায় একটা করে নতুন ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে।"

    আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে সেই দিনের ঘটনা সম্বন্ধে উল্লেখ করতে গিয়ে তানিয়া ভরদ্বাজ বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস তখন সবেমাত্র এক বছর ক্ষমতায় এসেছে ৷ সরকারের এক বছরের পূর্ণ হওয়ার পরেই একটি বেসরকারি ইংরেজি চ্যানেলে যুক্তি তক্কো অনুষ্ঠান ছিল, সেখানে বেশ কয়েকটি কলেজকে, তাদের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বর্ষের পড়ুয়াদের অনুষ্ঠানে যেতে বলা হয়েছিল ৷ বলা হয়েছিল যে, তাঁরা তাঁদের প্রশ্নগুলি মুখ্যমন্ত্রীকে করতে পারেন ৷ কিন্তু ঘটনাচক্রে আমার প্রশ্ন করার আগেই কয়েকজন পড়ুয়া তাঁকে (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে) এমন কিছু প্রশ্ন করেছিলেন যে, মুখ্যমন্ত্রী (তৎকালীন) তখনই বেশ কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন ৷ আমি যখন আমার প্রশ্নটা করলাম, তখন একেবারেই আর ধৈর্য রাখতে পারেননি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।" পরের ঘটনা আমাদের অনেকেরই মনে আছে ৷ তিনি মাইক ছুঁড়ে ফেলে শো ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং তানিয়াকে সিপিএম ক্যাডার এবং মাওবাদী স্টুডেন্টের বলে তকমা দেন।

    সত্যিই কি তানিয়ার করা প্রশ্নগুলি সিপিএম বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দল তাঁকে বলার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিল ? এই প্রশ্নের উত্তরে তানিয়া বলেন, "একেবারেই না ৷ আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজ্যের অবস্থা দেখে যে প্রশ্নগুলি স্বাভাবিকভাবে মনে এসেছিল, আমরা নিষ্পাপ মনে সেই প্রশ্নগুলি মুখ্যমন্ত্রী সামনে তুলে ধরেছিলাম৷ কেউ আমাদের কোনও প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য করেনি বা আমাদের কিছু শিখিয়ে দেওয়া হয়নি।"

    ওই দিন প্রসঙ্গে তানিয়া বলেন, "যদি কোথাও কোনও রকম দুর্নীতি কিংবা কোনও অনৈতিক কিছু ঘটে, মানুষের চোখে পড়ে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু প্রশ্ন করা উচিত ৷ অনেকে প্রশ্ন করেওছেন ৷ কিন্তু, এই সব প্রশ্নকে কখনও সরকারের গলা টিপে মারা উচিত নয় ৷ তাহলে, যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তার উপরেই তার প্রভাব পড়বে, ক্ষতি হবে।"

    ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারের বেশ কিছু পলিসি যেমন, হকার উচ্ছেদ বা বস্তি উচ্ছেদ কিছু মানুষের মধ্যে একটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে ৷ এই বিষয়ে তানিয়া বলেন, "আইন আইনের পথে চলে এবং জীবিকা তার নিজস্ব পথে চলে ৷ বেশ কয়েক বছরের বেআইনিভাবে যে সমস্ত জায়গা দখল করে রাখা হয়েছে, সেই জন্য একাধিক অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, বিভিন্ন গুদামে আগুন লেগেছে, সেটা ঠিক নয় ৷ ঠিক একইভাবে মানুষ যদি জীবিকাহীন হয়ে পড়েন, সেই বিষয়টিকেও কিন্তু সমর্থন করা যায় না। তাই এমন কিছু প্রশাসনিক নিয়ম এবং প্রকল্প-পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন যেখানে একটি সমতা বজায় থাকবে।"

    সুরেন্দ্রনাথ কলেজে যে ঘটনা ঘটে গিয়েছে সেই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী বলেন যে, এটা আসলে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ফল ৷ এর সঙ্গে ছাত্র রাজনীতি বা পলিটিসাইজেশন অফ এডুকেশনের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি হাজরা ল' কলেজর ঘটনাও এই দুর্নীতির প্রতিফলন। ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।" এই প্রসঙ্গে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, "সেখানে ছাত্র রাজনীতি আছে ৷ কিন্তু, তা একেবারেই রাজ্য রাজনীতির থেকে আলাদা। তাঁরা তাঁদের অভাব অভিযোগ এবং তাঁদের যে রাজনৈতিক অবস্থান, সেই বিষয়ে সরব হয়েছেন সবসময়। কারণ, সেই সব জায়গায় নিয়মিত ছাত্রনির্বাচন হয়, ছাত্র ইউনিয়নেও বদল হয় ৷ কিন্তু, এখানে তেমনটা হয় না।"

    একেবারে শেষে তানিয়া বলেন, "নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের যে আশা, আমারও সেই একই আশা। অর্থাৎ, রাজ্যে আবার জীবিকার সুযোগ তৈরি হোক। মানুষকে যেন সুশিক্ষা বা জীবিকার সন্ধানে নিজের ভিটে ছেড়ে দেশান্তরে যেতে না হয়।"
  • Link to this news (eTV Bharat)