• দোষী নাকি নির্দোষ ? প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপের গ্রেফতারিতে মুখ খুললেন কলাকুশলীরা
    eTV Bharat | ০৫ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 5 জুন: কলাকুশলীদের 26টি গিল্ডের মাথায় ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস। তকমা 'ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস'। কেউ ছিলেন তাঁর ডান হাত, কেউ বা বিরোধী। কিন্তু বিরোধিতা প্রকাশ্যে করার সাহস ছিল না কারওর। কেননা তাঁর ইশারাতেই নড়ত স্টুডিয়ো পাড়ার সব গাছের পাতা। বিরোধিতা করলেই জুটত না কাজ। বাড়ত কাজের অনিশ্চয়তা। শুধু কি তাই? তাঁর বিরোধিতা করলে হুমকি অবধি পৌঁছে যেত অভিযোগকারীর কাছে। আজ সে সব অতীত। শান্ত টলিপাড়া।

    'ভয় আউট ভরসা ইন'- এই বার্তা দিয়ে টলিপাড়াকে স্বস্তি আর শান্তি দিতে মরিয়া নতুন সরকারের প্রতিনিধি রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারীরা। ফেডারেশন ভেঙে 'কনফেডারেশন' গড়ে ওঠার কথা ঘোষণা করেছেন পাপিয়া অধিকারী। থাকবে না কলাকুশলীদের 26টি গিল্ডও। থাকবে বড়জোর চারটে গিল্ড। সেই চারটে গিল্ডের আওতাতেই থাকবেন নানা ক্ষেত্রের কলাকুশলীরা। এই সিদ্ধান্ত জানার পর টলিমহল্লায় বিক্ষোভ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয় টলিপাড়ায়। এর 24 ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই গ্রেফতার হন স্বরূপ বিশ্বাস। 'প্রাক্তন' ফেডারেশন সভাপতির গ্রেফতারিতে কী বলছেন কলাকুশলীরা?

    রূপসজ্জা শিল্পী পাপিয়া চন্দ বলেন, "আমি মানুষটাকে সামনাসামনি দেখেছি, ওঁর হাত থেকে পুরস্কারও নিয়েছি 'উৎকর্ষ সম্মান' অনুষ্ঠানে ৷ তার আগে দু'বার দেখাও হয়েছে৷ আমার সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করেন নি উনি৷ তবে, দুর্নীতি তো করছিলেনই৷ সেটা নিয়ে আমাদের মনে রাগ তো ছিলই ৷ আমাদের গিল্ডের যিনি সেক্রেটারি বাপি মালাকার, হঠাৎ একদিন বললেন আমরা যে প্রতিদিন যে রোজগারটা করছি তার 2 শতাংশ নাকি ওয়েলফেয়ারে দিতে হবে৷ হঠাতই আমাদের গিল্ড থেকে একটা ওয়েলফেয়ার করা হল৷ এরপর যেদিন জেনারেল মিটিং হল সেদিন স্বরূপ বিশ্বাস বললেন আমাদের 7.5 শতাংশ ওয়েলফেয়ার দিতে হবে ফেডারেশনকে।"

    পাপিয়া জানান, "এই নিয়ে আমাদের একটা রাগ তৈরি হয়। হঠাৎ করে কেন এটা মেনে নেবো আমরা? উনি বলেন, মেডিক্লেম, পরিবারের কল্যাণে এই 7.5 নেওয়া হবে। কিন্তু সেদিন মুখ খোলে নি কেউ ৷ আমিও না ৷ ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গিয়েছিলাম সেই সময়। আমার মা ছাড়া কেউ নেই ৷ যেটুকু জমানোর তো নিজেই জমিয়ে নিতে পারব, ফেডারেশনকে দিতে যাবো কেন? অনেক চেষ্টা করেছিলেন এই 7.5 শতাংশ নেওয়ার। আর করে উঠতে পারেন নি। আসার পর কিছু ভালো কাজও উনি করেছেন। এই যেমন, উনি আমাদের কাজের সময়সীমা 14 ঘণ্টা বেঁধে দিয়েছিলেন। তাতে আমরা উপকৃত হই ৷ এছাড়াও অনেক ভালো কাজ করেছেন ৷ হয়তো বিশ্বাস অর্জন করতে চেয়েছিলেন তখন। পরেরটা ভেবে রেখেছিলেন।"

    রূপসজ্জা শিল্পী কথায়, "জানি না কেন। তবে, আমার আজ কেমন লাগছে যদি জানতে চাওয়া হয় বলব, "আমার সঙ্গে কোনও দুর্নীতি হয়নি ৷ তবে, দুর্নীতি তো অনেকই করেছেন। অনেক টাকার হিসেব দিতে পারছেন না উনি। আমাদের সেক্রেটারির সঙ্গে ওনার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ওনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে অনেক দুর্নীতি করেছেন স্বরূপ দা। আমাদের উপরে উনি 2 শতাংশ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। বার্ষিক চাঁদা দিতে গেলে বলেছেন আগে 2 শতাংশ দাও ৷ তারপর চাঁদার বিল দেবো। এই ধরনের দুর্নীতি চলেছে এখানে ৷ কোথাও না কোথাও স্বস্তি মনে হচ্ছে আজ।"

    পাপিয়া চন্দ এদিন পাপিয়া অধিকারীর 26টা গিল্ড ভেঙে চারটি গিল্ডের ঘোষণা প্রসঙ্গে বলেন, "আমরা এক ছাতার তলাতেই ছিলাম ৷ মাথাটা গণ্ডগোলের ছিল ৷ সেটা পাল্টালেই তো হয়ে যায়। আমাদের সমস্যা অন্য গিল্ড কীভাবে বুঝবে।"

    জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত রূপসজ্জা শিল্পী সোমনাথ কুণ্ডু বলেন, "স্বরূপ দা'র সঙ্গে আমার আলাপ যেদিন উনি সভাপতি পদে বসেছেন তারও অনেকটা পরে ৷ তখন আমরা ফেডারেশনে অত যেতাম না, আমাদের ডাকা হত না। একটা বিশেষ একটা উন্নয়ণমূলক কাজের জন্য গিয়েছিলাম ওঁর কাছে। কোভিডকালে আমরা একটা ভিডিয়ো বানিয়েছিলাম কোভিডের সময়ে মেক আপ আর্টিস্টদের কী কী সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করা উচিত সেই নিয়ে। তখনই দেখা, আলাপ ৷ সেই সময়েই বুঝেছিলাম উনি ইন্ডাস্ট্রি সম্বন্ধে অনেককিছুই জানেন না। মেক আপ আর্টিস্ট কী ভাবে কোন পদ্ধতিতে কাজ করেন সেই বিষয়ে ওঁর কোনও আইডিয়াই নেই ৷"

    সোমনাথ কুণ্ডু জানান, "কোন ব্র‍্যান্ডের মেক আপ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করা হয় না সেই নিয়ে ওঁর কোনও ধারণাই নেই। এরপরে যখন রাহুল মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় ডিরেক্টররা স্ট্রাইক করেন তখন আমাদের ডাকা হয়। আমাদের কথা বলতে বলা হয় যে ইন্ডাস্ট্রির এই ঝামেলা যেন মিটে যায়। ডিরেক্টররা আমাদের ক্যাপ্টেম অফ দ্য শিপ এটা মানতে আমাদের কখনওই অসুবিধা হয়নি ৷ মূলত ওই সময়েই বেশি আলাপ হয়। এরপর নানা সময়ে কোনও গঠনমূলক কিছু কাজে উনি আমাকে অনেকবার ডাকেন ৷ পরবর্তিকালে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর যখন সম্মান জানানো হয় তখন আমি বলি, যাঁরা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাননি বা প্রচারের আলোয় আসেন না সেভাবে, তাঁদের যেন সম্মান জানানো হয় এখানে ৷ এই নিয়েও কথা হয় ৷ আসলে কখনও আমাকে ওঁর কাছে কাজ চাইতে যেতে হয়নি ৷ আর তাই ওঁর তরফ থেকে আমাকে কোনও সমস্যাও পেরোতে হয়নি ৷ কিন্তু এখন যাঁরা বলছেন ওনার বিরুদ্ধে পুরোটাই প্রমাণসাপেক্ষ। এখন দেখছি শুধু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নয়, আরও নানা কারণে উনি অভিযুক্ত। তাই ওনাকেও প্রমাণ করতে হবে উনি দোষী নাকি নির্দোষ। বাকিটা প্রশাসন দেখে নেবে৷"

    মেক আপ গিল্ডের এক মহিলা সদস্য টানা 2 বছর কাজ পাননি। সে কথা স্বরূপ বিশ্বাসের কাছে জানালে আসতে থাকে খুনের হুমকি। বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চেয়ে 10 এপ্রিল গল্ফ গ্রিন থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন রূপসজ্জা শিল্পী। সমাজমাধ্যমেও একটি ভিডিয়োতে সবটা ভাগ করে নেন তিনি। স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারিতে আজ বেজায় খুশি, সে কথা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, "অবশেষে চোখের জলের দাম পেলাম’!

    শিল্প নির্দেশক পার্থ মজুমদার বলেন, "আমি স্বরূপ দা'কে নিয়ে খবর যতটুকু দেখেছি তাতে গিল্ড সংক্রান্ত কোনও কারণে উনি গ্রেফতার হননি ৷ উনি অন্য সব অভিযোগের কারণে গ্রেফতার হয়েছেন ৷ ব্যক্তিগতভাবে উনি কেমন, কী কী করছেন সেটা আমাদের দেখার বা জানার কথা নয়৷ উনি নির্দোষ হলে সাজা পাবেন না৷ আর দোষী হলে যথাযথ শাস্তি পাবেন এটুকুই জানি৷ রইল পড়ে কাজ পাওয়া না পাওয়ার কথা। এখানে সবাই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায়। আমরা ফ্রিলান্সার। যোগ্যতা দেখিয়ে কাজ পেতে হয় আমাদের। তবে, কোনও প্রযোজকের কোনও টেকনিশিয়ানের কাজ ভালো লাগতেই পারে। হয়তো তিনি ভরসা করেন তাঁকে। তাই বারবার তাঁকে দিয়েই কাজ করান। নতুন কাউকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে চান না। আবার ব্যতিক্রমও হয়। নতুনরাও যোগ্যতা দেখিয়ে কাজ পান এখানে।"

    সাউন্ড রেকর্ডিস্ট শম্ভু দাস বলেন, "আমার ক্ষোভ বা বিক্ষোভ কিছুই নেই ওনার উপরে। আমি চাই যাঁরাই দায়িত্বে আসুক তাঁরা যেন সুন্দরভাবে কাজটা করতে দেন আমাদের। যেন সবাই সম্মানটা পায়, যেটা আজ হারাতে বসেছে।" তিনি আরও একটি দিকের কথা তুলে বলেন, "আমরা তিন বছর পর পর পারিশ্রমিকের 30 শতাংশ পাই। 2025-এর জুন মাসে দেওয়ার কথা তিন বছরের 30 শতাংশ টাকা। আর এখন বেড়ে গিয়েছে অনেকগুলো দিন। পাইনি এখনও বকেয়া টাকা এবং 30 শতাংশ টাকা। আজ কাল করে এখনও আসেনি। এই নিয়ে কেউ কোনও কথাও বলছে না। এই টাকাটা পেলে টেকনিশিয়ানেরা খুশি হবে, উপকৃত হবে। আগামীতে যাঁরা আসবেন তাঁদের কাছে এই প্রার্থণাই করি।"

    শম্ভু দাসের কথায়, "স্বরূপ দার গ্রেফতারের বিষয়ে আমি বিশেষ কিছু বলতে চাই না। ওটা ওনার ব্যক্তিগত জায়গা। তবে, চাই কাজ জানে এমন কেউ যেন গিল্ডগুলির অভিভাবক হন। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে চাই।"
  • Link to this news (eTV Bharat)