• ঢাল নেই, তরোয়াল নেই... পদত্যাগ ববির, সাংবিধানিক সঙ্কটে পড়বে পুরসভা?
    এই সময় | ০৬ জুন ২০২৬
  • এই সময়: তিনি ‘নিধিরাম সর্দার’ হয়ে আর পুরসভা চালাতে পারছিলেন না। এই যুক্তিতেই, শুক্রবার দুপুর তিনটে নাগাদ কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম।

    জল্পনা ছিলই। ৪ মে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসা ইস্তক কলকাতা পুরসভার অন্দরে ‘চূড়ান্ত অসহযোগিতা’–র অভিযোগ এনেছিলেন ফিরহাদ। বলেছিলেন, কোনও কাজই তাঁকে করতে দেওয়া হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার, তা নিচ্ছিলেন পুরসভার কমিশনার, আইএএস অফিসার স্মিতা পান্ডে। বুধবারেই খবর ছড়ায়, পদত্যাগ করতে চেয়েছেন ফিরহাদ। সে কথা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানালে তিনি নাকি সম্মতিও দিয়েছেন। যদিও সে দিন ফিরহাদ বলেছিলেন, ‘এখনও সেরকম কিছু ঘটেনি।’ বৃহস্পতিবার বিধাননগরের পুরনিগমের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী পদত্যাগ করেন। তিনিও জানান, কাজ করতে পারছিলেন না। এ বার ফিরহাদ।

    শুক্রবার কলকাতা পুরসভায় সাংবাদিক সম্মেলন করে পদত্যাগের কথা জানানোর পরে, চেয়ারপার্সন মালা রায়ের ঘরে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে আসেন ফিরহাদ। মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করলেও, পুরসভার ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার হিসেবে তিনি কাজ চালিয়ে যাবেন বলে জানা গিয়েছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, মেয়রের পদত্যাগের পরে কলকাতার পুর–বোর্ড কেন ভেঙে দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে দিন তিনেকের মধ্যে পুরসভাকে জবাব দিতে বলেছে রাজ্য পুর দপ্তর। কলকাতার পুর–আইন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, মেয়র পদত্যাগ করায় কলকাতা পুরসভার বর্তমান মেয়র–ইন–কাউন্সিল বা মেয়র পরিষদের আর কোনও অস্তিত্ব রইল না।

    দিন কয়েক আগে পুরসভায় নিজের কার্যালয়ে প্রাক্তন মেয়রদের টাঙানো ছবি দেখিয়ে ঘনিষ্ঠমহলে ফিরহাদ বলেছিলেন, ‘এ বার আমার ছবিটাও এখানে টাঙানো হবে।’ সেই ইঙ্গিতই বাস্তবের রূপ নিল শুক্রবার দুপুরে।

    শিয়ালদহের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কাউন্সিলার, বিধায়ক সজল ঘোষের অভিযোগ, ‘পদত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন। যাতে বর্ষার সময়ে কোনও দায়িত্ব পালন করতে না হয়।’ বিজেপির কাউন্সিলার মীনাদেবী পুরোহিত, বিজয় ওঝা, সন্তোষ পাঠকরাও এ দিন অভিযোগ করেন, কোনও কাজ করেননি ফিরহাদ। তাঁর আমলে বেআইনি নির্মাণের রমরমা হয়েছে। তিনি ঠিকাদারদের টাকা বাকি রেখেছেন। পুরসভার দেনা বাড়িয়েছেন। ঠিকাদাররা এখন টেন্ডারে অংশ নিতে চান না। বর্ষার আগে তাই পদত্যাগের নাটক করে পালালেন।

    ২০১৮–র ৩ ডিসেম্বর শোভন চট্টোপাধ্যায়ের পদত্যগের পরে কলকাতার মেয়র পদে শপথ নিয়েছিলেন ফিরহাদ। তখন তিনি পুরমন্ত্রী। তিন মাসের মধ্যে পুরসভার উপনির্বাচনে জিতে কাউন্সিলার হয়েছিলেন। ২০২০–র মে পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রথম দফার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় দফায়, ওই বছরের মে থেকে ২০২১–এর অক্টোবর পর্যন্ত ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন করোনা–র সময়। তৃতীয় দফায়, ভোটে জিতে ২০২১–এর ২৮ ডিসেম্বরে ফের মেয়রের দায়িত্ব নেন। এখনও মেয়র হিসেবে তাঁর সাত মাসের মেয়াদ বাকি। মেয়র হওয়ার আগে, ফিরহাদ ২০০১ থেকে দীর্ঘ দিন কাউন্সিলার ও বরো চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

    এ দিন সাংবাদিকদের পদত্যাগের কথা জানানোর আগে ফিরহাদ মেয়র হিসেবে তাঁর ‘সাফল্য’ ও ‘ব্যর্থতা’–র নাতিদীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেন। দাবি করেন, মেয়র হিসেবে তাঁর তিনটি বড় সাফল্য — করোনা, উম্পুন পরিস্থিতি–র মোকাবিলা ও ‘টক টু মেয়র’ চালু করা। ব্যর্থতার তালিকায় রয়েছে, পানীয় জলের নেটওয়ার্কের কাজ শেষ করতে না পারা, বৃষ্টির জমা জলের সমস্যা দূর করতে না পারা। তিনি জানান, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু মেয়র থাকার সময় থেকেই উত্তর কলকাতার ঠনঠনিয়ায় জল জমে। সেই জমা জলের সমস্যা দূর করতে উত্তর কলকাতার হৃষীকেশ পার্কে ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশন নির্মাণের কাজও শেষ করা যায়নি।

    পদত্যাগ কেন করলেন?

    ফিরহাদ বলেন, ‘কলকাতার মেয়র এবং রাজ্যের পুরমন্ত্রী হিসেবে দুটো দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেছি। দাপটের সঙ্গে পুরসভা চালিয়েছি। এখন কার্যত নিধিরাম সর্দার হয়ে গিয়েছি। সেই কথা নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়ে পদত্যাগের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই আমি মেয়র হয়েছি।’

    এই ডামাডোলের মধ্যেই আদালতের সম্মতিতে ১৯ জুন পুর অধিবেশন ডেকেছেন চেয়ারপার্সন মালা। মেয়রের পদত্যাগের পরে সেই অধিবেশনের ভবিষ্যত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক সূ্ত্রে জানা গিয়েছে, বিধানসভার মতোই, তৃণমূলের পুর–দলেও বড়সড় বিদ্রোহী গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। মেয়রের পদত্যাগের পরে তৃণমূলের বেশ কিছু কাউন্সিলারও পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে পুরসভার একাধিক সূত্রে জানা গিয়েছে। বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে, আগামী দিন তিনেকের মধ্যে তাঁদের কাউন্সিলাররা পুর কমিশনারের সঙ্গে দেখা করবেন।

    এই অচলাবস্থা কি পুরসভাকে কোনও সাংবিধানিক সংকটের মুখে ফেলতে পারে?

    পুরসভার প্রাক্তন মেয়র, আইনজীবী, সিপিএমের বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘মেয়র পদত্যাগ করা মানে মেয়র পরিষদের অস্তিত্ব বিলোপ। পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকাও হ্রাস পেল। এক জন প্রশাসকের অধীনে আমলারা পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এই ভাবে আপাতত চলবে। পরে ভোট করে, নতুন বোর্ড করতে হবে।’

    এ দিন পুরসভায় পৌঁছে চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ বসু–সহ প্রয়াত প্রাক্তন মেয়রদের ছবিতে প্রণামও করেন। এ দিন কোনও মেয়র পারিষদকে পুরসভায় দেখা যায়নি। ফিরহাদের পাশে শুধু উত্তর কলকাতার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার সুনন্দা সরকার ছিলেন। আর ফিরহাদ পুরসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় গল্ফগ্রিনের ৯৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার তপন দাশগুপ্ত–র। ফিরহাদের হাত ধরে কেঁদে ফেলতে দেখা যায় তাঁকে।

  • Link to this news (এই সময়)