এই সময়: টলিউডের শিল্পী–কলাকুশলীদের কল্যাণের জন্যে যাঁর কাজ করার কথা ছিল, তিনিই কি না দলবল নিয়ে বন্দুক দেখিয়ে সেই শিল্পী–কলাকুশলীদের কাছ থেকে দিনের পর দিন তোলাবাজি করতেন! এমনকী, মহিলাদের কুপ্রস্তাব দিতেন দলবল পাঠিয়ে! রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেপ্তার হতে এমন গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ সামনে আনছেন টলিপাড়ার মেকআপ আর্টিস্ট থেকে শুরু করে টলিউডের টেকনিশিয়ানরা।
তোলাবাজি–শ্লীলতাহানির পাশাপাশি অস্ত্র আইনে বৃহস্পতিবার স্বরূপকে গ্রেপ্তার করেছে নিউ আলিপুর থানা। শুক্রবার আলিপুর আদালতে ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’–র প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপকে পেশ করে পুলিশের দাবি, অস্ত্র দেখিয়ে কলাকুশলীদের থেকে তোলাবাজির ঘটনায় তিনি অভিযুক্ত। অন্তত ৫০ জনের কাছ থেকে গড়ে ৪৫ হাজার করে টাকা নিয়েছেন তিনি। কেন এই টাকা দাবি করা হতো? পুলিশ সূত্রের দাবি, কাউকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে, কেউ পেশাগত বা অন্য কোনও সমস্যার কথা জানাতে গেলেই তাঁর কাছ থেকে প্রথমে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা করে চাওয়া হতো। তারপরে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা! অর্থাৎ, অসুবিধার বিবরণ অনুযায়ী ঠিক হতো বাকি টাকার অঙ্কটা! এ দিন আদালতে সরকারি কৌঁসুলি যুক্তি দেন, এ বিষয়ে আরও তথ্য পেতে স্বরূপকে হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্তের পক্ষের আইনজীবীরা স্বরূপের জামিনের আবেদন করলেও, তা খারিজ করে ১৮ জুন পর্যন্ত তাঁকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
এই গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ পুলিশের কাজ৷ বিষয়টি সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা নেই৷ আমি শুনেছিলাম, এই স্বরূপই নাকি টলিউড চালাতেন৷ তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে সব কাজকর্ম হতো৷ আমি দলের কথা বলতে পারি। দলের পক্ষ থেকে আমরা যে কোনও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে৷ আমরা মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে৷ শিল্পীর সত্তাকে আত্মসাত্ করার বিরুদ্ধে৷’
পুলিশ সূত্রের খবর, যাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে স্বরূপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই মূল অভিযোগকারী পেশায় একজন মেকআপ আর্টিস্ট। তিনি পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, গত দু’বছর ধরে তিনি কাজ পাননি। এর পরে, স্বরূপ বিশ্বাসের দ্বারস্থ হন তিনি। জনৈক শান্তনু দে তাঁকে গত ৪ এপ্রিল সামনাসামনি দেখা করতে বলেন। সেখানে গেলে স্বরূপের হয়ে কুপ্রস্তাব দিয়ে তাঁকে প্ররোচিত করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন মহিলা। এ বিষয়ে মুখ খুললে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় তাঁকে। পরের দিন স্বরূপের লোকজন ওই মহিলার বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চওড়াও হন। এই ঘটনার পরে ৯ এপ্রিল রিজেন্ট পার্ক থানায় স্বরূপের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলেন তিনি। অভিযোগকারিণীর দাবি, সেই অভিযোগ নিতে চাননি পুলিশকর্মীরা। তার পরে, গত ১০ এপ্রিল স্বরূপের নেতৃত্বে নির্যাতিতার বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ফের চড়াও হয় তাঁর দলবল। তবে সে বারও ভয় দেখিয়ে চলে যায় তারা। একই ভাবে অভিযোগকারিণীর কয়েকজন পরিচিতকেও হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই মেকআপ আর্টিস্ট।
এ দিন আদালতে সরকারি কৌঁসুলি সৌরীন ঘোষাল যুক্তি দেন, ‘অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ সামনে আসছে। তিনি ৪৫ হাজার টাকা করে ৫০ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। এমনকী, অস্ত্র দেখিয়ে তোলবাজিও করার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। তাঁকে পুলিশ হেফাজতে রাখার প্রয়োজন।’ সরাসরি রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের নাম না–করে আদালতে সরকারি কৌঁসুলি বলেন, ‘প্রভাবশালী প্রাক্তন মন্ত্রীর লক্ষ্মণ ভাই! তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছে পুলিশের কাছে। সেই অভিযোগগুলি পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হলে অভিযুক্তকে হেফাজতে নিতেই হবে।’ যদিও এই বিষয়ে অরূপের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এ দিন অভিযোগকারিণীর তরফে প্রশান্ত মজুমদার, চন্দন সাহা–সহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী সওয়াল করেন। চন্দন বলেন, ‘ব্যক্তি স্বার্থে তোলাবাজি করেছেন স্বরূপ বিশ্বাস। মহিলাদের শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করেছেন। আমার মক্কেলকে বন্দুক দিয়ে ভয় দেখিয়েছেন। জামিন পেলে প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে মূল অভিযোগকারিণী এবং অন্যদের।’ যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তের আইনজীবীরা। তাঁর তরফে এ দিন আদালতে সওয়াল করেন বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় এবং গোপাল হালদার। তাঁরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মৌমিতা রায়ের উদ্দেশে বলেন, ‘এই অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। পুলিশ কি টাকা উদ্ধার করতে পেরেছে? অস্ত্র উদ্ধার করেছে? যেখানে যেখানে ঘটনাগুলো বলা হচ্ছে, সেই জায়গাগুলো সিসিটিভিতে মোড়া। কোনও ফুটেজ রয়েছে? ইচ্ছাকৃত ভাবে স্বরূপ বিশ্বাসের নাম নেওয়া হচ্ছে। মক্কেলকে জামিন দেওয়া হোক।’
বৃহস্পতিবার স্বরূপকে গ্রেপ্তার করে নিউ আলিপুর থানা থেকে বের করে লালবাজারে সেন্ট্রাল লকআপে নিয়ে যাওয়ার সময়েই এলাকার বহু মানুষ থানা চত্বরে বিক্ষোভ দেখান। কেউ কেউ স্বরূপকে লক্ষ্য করে কাঁচা ডিম ছোড়ার প্রস্তুতিও নিয়ে এসেছিলেন। যদিও বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর তৎপরতায় কোনওক্রমে তাঁকে প্রিজ়ন ভ্যানে তুলে বের করে দেওয়া হয়। এ দিনও কোর্ট চত্বরে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হতে পারে, এই আশঙ্কায় আলিপুর আদালতে বড় পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তবে স্বরূপকে কোর্ট লকআপে ঢোকানোর আগে বিক্ষোভ দেখান বিজেপিপন্থী আইনজীবীদের একাংশ। নিউ আলিপুর থানার মামলায় স্বরূপ গ্রেপ্তার হলেও নিরাপত্তার কারণে এখনও তাঁকে সেন্ট্রাল লকআপেই রাখা হচ্ছে।