• টাকা দিলে কিছু না জেনেও কাজ! স্বরূপের ‘স্বরূপ’ খুলছে টলিউড
    এই সময় | ০৬ জুন ২০২৬
  • জয় সাহা

    ফেলো কড়ি মাখো তেল। কাজ পাওয়া যাবে টাকার বিনিময়ে। গিল্ডের কার্ডও পাওয়া যাবে টাকা দিয়ে। শুটিংয়ের অনুমোদন? সেটাও টাকা। ফলে টাকা ছাড়া যে পৃথিবীতে কিছু হয় না, সেটা নিজের ছোট্ট গণ্ডিতে বার বার প্রমাণ করেছেন টলিউডের ফেডারেশনের নেতা স্বরূপ বিশ্বাস। টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় আগে ফিসফাস শোনা যেত এ সব নিয়ে। কিন্তু এখন রাখঢাক না করেই বহু কলাকুশলী স্বরূপের ‘স্বরূপ’ উন্মোচন করতে চান। গ্রেপ্তার হওয়া স্টুডিও পাড়ার ‘স্বঘোষিত নেতা’ স্বরূপের বিরুদ্ধে অভিযোগ–– বিন্দুমাত্র সিনেমার কাজ না জানলে এবং কাজ না করলেও তাঁর নেতৃত্বে চলা কলাকুশলীদের সংগঠন ফেডারেশনের অধীনে থাকা বিভিন্ন গিল্ডের মেম্বার হওয়া যেত সহজে। বদলে শুধু একটু খরচ করলেই চলত!

    টলি পাড়ার এক বর্ষীয়ান পরিচালকের কথায়, ‘বিভিন্ন লোককে গিল্ডের সদস্য করা হয়েছিল, যাঁরা আদতে সিনেমা শিল্পের সঙ্গে যুক্তই নন। কেউ অটো চালান, কেউ আবার হকারি করেন।’

    ফেডারেশনের অধীনে মোট ২৬টি গিল্ড রয়েছে। কোনওটা ক্যামেরাম্যানদের, কোনওটা মেক আপ আর্টিস্টদের, কোনওটা আবার হয়তো প্রোডাকশন ম্যানেজারদের। সেখানেই টাকার বিনিময়ে গিল্ড কার্ড পেতেন অটো চালক বা হকাররা। এদের কাজ ছিল স্বরূপের সঙ্গে বাইকে করে টালিগঞ্জের স্টুডিওগুলোতে চক্কর কেটে ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করা। আর ফেডারেশন ও গিল্ডের ভোট হলে স্বরূপ এবং তাঁর লোকেদের জিতিয়ে আনা। বদলে তাঁরা কী পেতেন? এক প্রযোজকের কথায়, ‘স্বরূপ ঠিক করতেন প্রতিটা ছবি আর সিরিয়ালের জন্য কতজনকে নিতে হবে। হয়তো আমার একজন ট্রলি ম্যান দরকার। কিন্তু নিয়ম ছিল, চার জনকে নিতে হবে। বাকি তিনজনের কোনও কাজ না থাকলেও পয়সা দিতে হতো।’ অভিযোগ, এই বাকি তিনজনের বেশির ভাগটাই হলো এমন ভুতুড়ে গিল্ড কর্মী, যাঁরা হয়তো সকালে একবার হাজিরা দিয়ে অটো চালাতে চলে যেতেন। দুপুরে শুটিং ফ্লোরে খাওয়া দাওয়া করে তারপর বিকেল বা রাতে শুটিং শেষ হলে দৈনিক পারিশ্রমিক আদায় করে নিতেন। কিছু টাকার ভাগ অবশ্যই দিতে হতো। বাকিটা উপরি।

    এখানেই শেষ নয়, বছর খানেক আগে ফেডারেশন ঠিক করে কলাকুশলীদের দৈনিক পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করা হবে। সেই মতো নতুন রেট চার্ট তৈরি হয়। কিন্তু সেখানেও স্বরূপের বাহিনী থাবা বসান। সাময়িক ভাবে বলা হয়েছিল, ফেডারেশনের একটি বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। সেখানে চাঁদা দিতে হবে। অর্থাৎ ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় যে, কর্মীরা বর্ধিত হারে পারিশ্রমিক পেয়ে নিজেরা পুরোনো রেটেই টাকা রাখতেন, আর বাকি অংশ দিয়ে দিতে হতো চাঁদা হিসেবে।

    এ ছাড়া স্বরূপ এবং তাঁর বাহিনী ‘গুপি শুটিং’ বলে একটি শব্দবন্ধ তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ ফেডারেশনের থেকে অনুমতি না নিয়ে শুটিং করা। টলি পাড়ার অনেক কর্মী জানাচ্ছেন, স্বরূপ ও তাঁর বাহিনী এই ‘গুপি শুটিং’–য়ের বিরোধিতা করলেও তাঁরা চাইতেন সেটা আসলে চলুক। আর সেখানে কায়দা করে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে দিতেন তাঁরাই। যে এলাকায় ‘গুপি শুটিং’ হচ্ছে আগাম খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যেত স্বরূপের বাহিনী। এরপর ব্যান করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে স্পট থেকে তুলে নেওয়া হতো জরিমানার হাজার হাজার টাকা। প্রযোজরা ভয়ে সেই টাকা দিতে বাধ্য হতেন বলে অভিযোগ। এ ছাড়াও প্রতিটি শুটিংয়ে কোথা থেকে খাবার আসবে, কে গাড়ি ভাড়া দেবে, কে টেবিল–চেয়ার সাপ্লাই করবে, এই তালিকাও ঠিক করে দিতেন স্বরূপ। করোনার সময়ে যখন শুটিং বন্ধ, তখন স্বরূপের নেতৃত্বাধীন ফেডারেশন প্রচুর টাকা, খাদ্য সামগ্রী বিলিয়েছিল। তার বেশিরভাগটাই ক্যাশে দেওয়া হতো। এখন অবশ্য বহু কর্মী সেই টাকার উৎস কী, সেই দাবিতে সরব। ভিন রাজ্যে বা বিদেশের শুটিং হলেই কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক প্রায় দ্বিগুণ কখনও কখনও তিন গুণ বেড়ে যেত। এই চাপে একটি বাংলাদেশি বিনোদন অ্যাপ কলকাতায় কাজ শুরু করেও ফেডারেশনের দাপটে তা বন্ধ করে দেয়।

    এই অবস্থায় প্রথম সারির একাধিক অভিনেতা,পরিচালক, প্রযোজকরা এর বিরুদ্ধে মুখ খোলেন। মামলাও করেন। সেই মামলা অবশ্য পরে খারিজ করে দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু যাঁরা সে সময়ে মুখ খুলেছিলেন, তাঁদের কাজ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত কেউ ভিডিয়োতে ক্ষমা চেয়ে, কেউ স্বরূপের সঙ্গে দেখা করে তা মিটিয়ে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু অভিনেতা–পরিচালক অনির্বাণ ভট্টাচার্য, পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর মতো কিছু মানুষ থেকে যান, যাঁরা নিজেদের স্ট্যান্ড থেকে সরেননি। কিন্তু তাঁরা কেউ আর কাজেও ফিরতে পারেননি।

    এদিকে, স্বরূপের কথা না শোনায় তাঁর বাহিনীর দাপটে ২০২৪ থেকে একের পর এক কাজ হারান হেয়ার ড্রেসার তনুশ্রী দাস। তিনি আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেন। তাঁকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। তনুশ্রী এ দিন বলেন, ‘অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছি। এখন সামনে এসেছে স্বরূপ বিশ্বাসের আসল রূপ। আমি একা নই, আরও অনেক শিল্পীর সঙ্গেই অন্যায় হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত আমাদের ২৬টা গিল্ডের আরও বেশ কিছু বড় মাথা। সেই জন্যই তো এ সব করতে পেরেছেন স্বরূপ।’

  • Link to this news (এই সময়)