এই সময়: দড়ি টানাটানি চরমে!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ফোন করে দলের বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের মন ভেজানোর চেষ্টা চালালেও তৃণমূলের বিদ্রোহী এমএলএ–দের টিমে সদস্য সংখ্যা আরও বাড়তে চলেছে বলে দৃঢ় প্রত্যয়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী ১৮ জুন বিধানসভার অধিবেশন শুরু হলেই এই সংখ্যা সবাই দেখতে পাবেন বলে শুক্রবার দাবি করেছেন ঋতব্রত। আবার কালীঘাটও লড়াইয়ে পিছু হটতে নারাজ। এই টানাপড়েনের রেশ গড়াতে পারে আদালত পর্যন্ত। বিদ্রোহী বিধায়কদের কেউ কালীঘাটে না গেলেও ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হবে বলে এ দিন জানিয়েছেন তৃণমূলের আইনজীবী নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
এ দিন কালীঘাটে তৃণমূলনেত্রীর বাসভবনে বৈঠকের পরে কল্যাণ বলেন, ‘বিধানসভার স্পিকার যে ভাবে বিরোধী দলনেতা নিয়োগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে আমরা আদালতে যাচ্ছি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে সোমবার হাইকোর্টে পিটিশন ফাইল করা হবে। এ বার কারা বৈধ, কারা অবৈধ— তা আদালত ঠিক করবে।’ যদিও ঋতব্রত–সহ বিদ্রোহী শিবির দাবি করছেন, পরিষদীয় রীতি মেনেই বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করা হয়েছে। তাই তৃণমূল মামলা করলেও সুবিধা করতে পারবে না। ঋতব্রতর কথায়, ‘আদালতে যাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। পরিষদীয় রীতি মেনেই পরিষদীয় দলের বৈঠক করে তৃণমূলের দুই তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়ক বিরোধী দলনেতা ও বিরোধী সচেতক নির্বাচন করেছেন। সেই রেজ়োলিউশনকে মান্যতা দিয়েছেন অধ্যক্ষ। ওঁরা কী করবেন, তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি না।’
বিদ্রোহী শিবিরে থাকা দুই বিধায়ক গুলশন মল্লিক ও সঙ্গীতা বসুনিয়া বৃহস্পতিবার খোলাখুলি জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের সর্বোচ্চ নেত্রী। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের পরিষদীয় দলের স্রেফ পরামর্শদাতার ভূমিকায় থাকবেন এমন সিদ্ধান্ত তাঁরা মানবেন না বলে গুলশন ও সঙ্গীতা স্পষ্ট জানান। পাঁচলার পোড়খাওয়া বিধায়ক গুলশন এটাও জানান, হাওড়া জেলার পাঁচ–ছ’জন তৃণমূল বিধায়ক কোনও অবস্থাতেই মমতাকে শুধু পরামর্শদাতার ভূমিকায় মানবেন না। গুলশন ও সঙ্গীতার মন্তব্যের পরে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তৃণমূলের বিধায়করা কি ফের কালীঘাটমুখী হচ্ছেন?
যদিও তৃণমূল সূত্রের খবর, কালীঘাটের বৈঠকে শুক্রবার সব মিলিয়ে ৮ জন বিধায়ক হাজির ছিলেন। এ দিকে ঋতব্রত মনে করছেন, গুলশন ও সঙ্গীতার বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে বিকৃত করা হয়েছে। সন্দীপন সাহার বাড়িতে হামলার ঘটনার পরে শুক্রবার ঋতব্রতর নেতৃত্বে তৃণমূলের বিধায়করা এন্টালির তৃণমূল বিধায়কের বাড়িতে যান। গুলশন–সঙ্গীতা বৃহস্পতিবার যে মন্তব্য করেছেন, সেই প্রসঙ্গে ঋতব্রত বলেন, ‘দেখুন, সবাই মিডিয়াতে কথা বলতে পটু নন। আমরা জানি, সংবাদমাধ্যম কী ভাবে মন্তব্য টুইস্ট করে। তাই ১৮ তারিখ আসুক সবাই দেখতে পাবেন, সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তার আগে কত জল কত দিকে গড়াবে, দেখবেন।’
জোড়াফুলের বিদ্রোহীদের অসন্তোষ দূর করতে মমতা নিজে গত কয়েক দিনে একাধিক বিধায়ককে নিজে ফোন করেছেন বলে তৃণমূল সূত্রের খবর। তৃণমূলের জয়ী ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে এমনও কয়েকজন রয়েছেন, তাঁদের মমতা নিজে আগে কদাচিৎ নিজে ফোন করেছেন। জোড়াফুলের একাংশের দাবি, সেই বিধায়করা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ফোন পেয়ে কিছুটা দোলাচলে পড়ে যান। কিন্তু বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু কাছে জমা পড়া রেজ়োলিউশনে তাঁদের স্বাক্ষর রয়েছে। সেখান থেকে ফের ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব কি না, তা নিয়েও একাধিক বিধায়ক ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করেছেন।
ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের পরিষদীয় দল এই ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল। সেই অনুযায়ী রণকৌশল তৈরি করে তাঁরাও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করছেন। সেই কারণেই ঋতব্রত এ দিন বলেন, ‘বিধানসভায় আমরা দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যা জমা দিয়েছি। আমাদের সঙ্গে যে সংখ্যা রয়েছে, সেই সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকবে। এই সংখ্যা কমার কোনও প্রশ্ন নেই। আমরা দৃঢ়বিশ্বাসী।’ কালীঘাটে এ দিন বিকেলে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠক ডেকেছিলেন। সেই বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অসীমা পাত্র— তৃণমূলের পুরোনো কয়েকজন বিধায়ক ছিলেন। মমতার ফোনেও কালীঘাটে বিধায়কদের ঢল নামেনি বলে বিদ্রোহী শিবিরের পর্যবেক্ষণ। এ ছাড়া কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো নেতা–নেত্রীরা বৈঠকে ছিলেন। যদিও তৃণমূলের বক্তব্য, এটা দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক ছিল। এই কর্মসমিতির যাঁরা সদস্য, তাঁরাই বৈঠকে এসেছিলেন।
বৈঠকে ঢোকার আগে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র বলেন, ‘২ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করেছেন। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কি কেউ আছেন, যিনি বিধায়ক পদে ইস্তফা দিয়ে ফের সেখানে গিয়ে ভোটে লড়াই করবেন? যদি কেউ জিতে আসতে পারেন, তাঁকে আমি সেলাম করব।’ তৃণমূলের পক্ষ থেকে মদন, কুণাল ঘোষ–সহ একদল নেতা গত কয়েক দিন ধরে এই কথা বলায় ঋতব্রত পাল্টা বলেছেন, ‘এঁদের হতাশার কারণ কী, তা পরে বিশদে বলব। আগামী দিনে হয়তো এঁদের হতাশা আরও বাড়বে। সোম–মঙ্গল–বুধবারে হয়তো হতাশা আরও বেশি হবে।’ তৃণমূলে মুষলপর্ব চলছে বলে মনে করছে শাসক বিজেপি। তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে টক্কর দেখে বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘তৃণমূলের নেতারা এখন নিজেদের বিধায়ক পদ বাঁচাতে ব্যস্ত। তৃণমূল শেষ হয়ে গিয়েছে। নিজেদের মধ্যে লড়াই চলছে। আগামী দিনে হয়তো তৃণমূল ভেঙে ছোট ছোট সাত–আটটা পার্টি তৈরি হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল মুছে যাবে।’