• সন্দেহের আবহ দিল্লিতে তৃণমূলের অন্দরমহলেও, ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকের আগেই ভাঙনের সুর
    এই সময় | ০৬ জুন ২০২৬
  • এই সময়, নয়াদিল্লি: কলকাতা থেকে দিল্লি— ৪ মে বিধানসভা ভোটের ফল বের‍নোর ঠিক একমাসের মধ্যে প্রব‍ল ঝড় বিজেপি বিরোধী শিবিরে! সেই ঝড়ে বঙ্গে তৃণমূ‍ল‍ে যেমন ভাঙনের পরিস্থিতি, তেমনই বড়সড় ফাটলের ইঙ্গিত জোড়াফুলের সংসদীয় দল এবং গোটা ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরেই।

    আগামী সোমবার, ৮ জুন দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রস্তাবিত বৈঠক রয়েছে। বিজেপি বিরোধী দলগুলির এই বৈঠকে কংগ্রেসের ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত থাকবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে এমকে স্ট্যালিনের দল ডিএমকে ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি। তেজস্বী যাদবের আরজেডি এবং অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টিও এখনও ওই বৈঠকে থাকার ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দেয়নি। তবে কোটি টাকার প্রশ্ন, তৃণমূল কী করবে? কারণ, এই মুহূর্তে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা ৪১। বিধানসভার মতো দিল্লিতে জোড়াফুলের সংসদীয় দলেও আড়াআড়ি ফাটল ধরবে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। তৃণমূল সাংসদদের মধ্যে যিনি প্রথম এই বিদ্রোহের ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন, সেই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের একটি পোস্টে সেই গুঞ্জন চরমে উঠেছে। এক্স হ্যান্ডলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ট্যাগ করে বারাসতের সাংসদ লিখেছেন, ‘আপনার কী মনে হয়, একটি রাজনৈতিক পরিবারের চার বারের সাংসদ, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থেকে চার দশক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তিনি নিজের কথা ভাবেন? এটি নীতির বিরুদ্ধে রায় এবং শাসনের ব্যর্থতা৷’ বলা বাহুল্য, বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের পর্যুদস্ত হওয়া নিয়েই তৃণমূলনেত্রীকে বার্তা দিতে চেয়েছেন তিনি। এরপরে প্রাক্তন ইউএস প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের একটি ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও তিনি পোস্ট করেছেন, ‘ইফ ইউ ওয়ান্ট টু মেক এনিমিজ়, ট্রাই টু চেঞ্জ সামথিং।’ অর্থাৎ, শত্রু তৈরি করতে চাইলে, কিছু বদলের চেষ্টা করো।

    বদল কি তবে দলের অন্দরেই? কাকলি আর সেটা ভাঙেননি। তবে রাজধানীতে তৃণমূলের অন্দরের খবর, সেখানে এখন প্রবল সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে৷ সূত্রের খবর, গত কয়েকদিন ধরেই প্রতি তিন–চার ঘণ্টা অন্তর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ দু’–তিন জন প্রথম সারির তৃণমূল নেতা দলের সাংসদদের একে একে ফোন করে তাঁদের খবর নিচ্ছেন, তাঁরা কোথায় আছেন, কী করছেন৷ সূত্রের দাবি, এমনই ফোন গিয়েছিল তৃণমূলের লোকসভা সাংসদ জগদীশ বসুনিয়ার কাছে৷ তিনি ওই নেতাকে জানান, তাঁর ছেলে দিল্লির হাসপাতালে চিকিত্‍সাধীন৷ ছেলের চিকিত্‍সার জন্যই তাঁরা সপরিবার দিল্লিতে আছেন, সঙ্গে আছেন সাংসদের স্ত্রীও৷ কলকাতায় থাকা তৃণমূলের প্রথম সারির ওই নেতা তাঁর কথায় বিশ্বাস করেননি৷ বসুনিয়াকে বলা হয়, হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ ছেলের ছবি পাঠাতে৷ বসুনিয়া সেই ছবিও পাঠান৷ গোটা ঘটনা জানিয়ে তিনি দলনেত্রীকে মেসেজও করেন৷ তবে কোনও উত্তর মেলেনি৷

    তা হ‍লে কি জোড়াফুল ঘেঁটে তছনছ করছে পদ্ম শিবির?

    তৃণমূলকে আমল দিতেই নারাজ বঙ্গ–বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর কটাক্ষ, ‘কেউ কোনও তৃণমূল বিধায়ককে ফোন করেননি৷ কেউ কোনও তৃণমূল সাংসদকেও ফোন করেননি৷ ফোন তৃণমূল থেকে আসছে৷ ভোটের আগে এসেছে, ভোটের পরেও এসেছে৷ তৃণমূল কংগ্রেস কোনও দিনই কোনও রাজনৈতিক দল ছিল না৷ তৃণমূল এখন অতীত৷’ শমীকের সংযোজন, ‘আগামী দিনে তৃণমূলকে নিয়ে ইসলামিক হিস্ট্রিতে একটা চ্যাপ্টার থাকবে৷ এটা এমন একটা দল ছিল, যার নীতিই ছিল দুর্নীতি৷ এই দলের নেতারা দু’হাতে দু’টি ঘড়ি পরতেন৷ কিন্তু সময় কাউকে ক্ষমা করে না৷ মানুষ প্রমাণ করে দিয়েছে রাজনীতিতে ঔদ্ধত্য, দখলদারি এবং দুর্নীতির কোনও স্থান নেই।’

    এই অবস্থায় ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে কি আদৌ অংশ নেবে তৃণমূল? গেলেও সেখানে বিরোধীরা কতজন থাকবেন, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। শমীকের কটাক্ষ, ‘ইন্ডিয়া জোট, ইসলামিক জোট এই সব মাঝে মাঝে শোনা যায়৷ কোনও দল বিপদে পড়লে সে এই জোটে আসে৷ যখন সেই দলের (তৃণমূল) সময় ভালো যাচ্ছে বলে মনে হয়, তখন তারা মিটিং চলাকালীনই নিজেদের মর্জিমতো ঘোষণা করে দিয়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে যায়৷ এই জোটে কোনও দিন দেখা যায়নি যে, সব দলের নেতা একসঙ্গে বসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন৷ এটা কাঁঠালের আমসত্বের মতো!’

    এই টানাপড়েনের মধ্যে ডিএমকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা সোমবার দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে থাকবে না৷ তামিলনাড়ুতে মুখ্যমন্ত্রী তথা টিভিকে সুপ্রিমো থালাপতি বিজয়ের হাত ধরা কংগ্রেসকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিতেও পিছপা হয়নি ডিএমকে৷ এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস চাইছে, তামিলনাড়ুর নতুন শাসকদল টিভিকে-কে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সামিল করতে৷ সূত্রের দাবি, কংগ্রেসের এই প্রস্তাবে এখনও পুরোপুরি সম্মতি জানায়নি আরজেডি এবং সপা৷ একদম নতুন একটি রাজনৈতিক দল, যাদের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব নেই, তাদের রাতারাতি ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক করার আগে বাস্তব ছবিটা ভালো ভাবে খতিয়ে দেখা উচিত— এমনটাই অভিমত সপা এবং আরজেডি সূত্রের৷ এই ইস্যুতে তৃণমূলের তরফে কোনও আপত্তি করা হয়নি বলেই সূত্রের দাবি৷

    এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস বিলকে কেন্দ্র করে বিরোধী জোটের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে৷ এর আগে কংগ্রেস–সহ বিরোধী শিবিরের দাবি ছিল, আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিল সংসদে নিয়ে আসার আগে সরকার তাদের সঙ্গে সবিস্তার আলোচনা করুক এবং প্রধানমন্ত্রীর পৌরোহিত্যে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হোক৷ সংসদীয় সূত্রের দাবি, সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই ডিএমকে এবং তৃণমূলের সঙ্গে আসন পুনর্বিন্যাস বিল নিয়ে প্রাথমিক স্তরের আলোচনা শুরু হয়েছে৷ এর পরে সরকার যদি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার লক্ষ্যে সব বিরোধী দলের সহযোগিতা চায়, তা হলে চাপ বাড়বে বিরোধী জোটের উপরে৷

    ইতিমধ্যে লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদদের একটা বড় অংশ যে বেসুরো হয়েছেন, তা একান্তে মেনে নিচ্ছেন দলের প্রথম সারির অনেক নেতাই৷ এই বিক্ষুদ্ধ সাংসদরাই যদি লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হাউসে তাঁদের নেতা (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) বদলের দাবি জানান, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলেও মনে করছে রাজধানীর রাজনৈতিক মহল৷ ফলে সোমবার রাজধানী দিল্লিতে যাবতীয় রাজনৈতিক গতিবিধি তুঙ্গে উঠবে বলেই অনুমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের৷ ঘটনাচক্রে সোমবারই দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রস্তাবিত বৈঠক চলার সময়ে কেন্দ্রের ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে বাংলার সংযুক্তিকরণ সংক্রান্ত মউ স্বাক্ষরের জন্য রাজধানীতে থাকার কথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীরও৷ ফলে যত কাণ্ড এখন রাজধানীতে!

  • Link to this news (এই সময়)