• সুদৃশ্য রেস্তোরাঁ, কর্পোরেট ধাঁচের চেম্বার, দীপক রায়ের ছিল নিজস্ব বাহিনীর বালি-পাচার নেটওয়ার্কও
    এই সময় | ০৬ জুন ২০২৬
  • এই সময়, ময়নাগুড়ি: ময়নাগুড়ি ব্লকের সাপ্টিবাড়ি এলাকার মুকুটহীন সম্রাট দীপক রায় এখন পুলিশের জালে। অবৈধ বালির ব্যবসা চালানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের মারধর-সহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। প্রভাবশালী হওয়ায় এত বছর দীপকের টিকি ছুঁতে পারেনি পুলিশ।

    তৃণমূল ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পরে জেলায় জেলায় সিন্ডিকেট, কাটমানি, তোলাবাজির অভিযোগে একের পর এক নেতা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। গত সোমবার দীপককে পাকড়াও করে পুলিশ। বেআইনি বালি পাচারকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি। পাচারের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় মোটরবাইকে নজরদারি চালানো হতো। প্রশাসনের আধিকারিক, পুলিশ কিংবা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা কোন রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছেন, সেই তথ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হতো চক্রের অন্যান্য সদস্যদের কাছে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমেও বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান করা হতো বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। কোন গাড়ি কোথায় যাচ্ছে, কোন এলাকায় নজরদারি চলছে কিংবা কোথায় অভিযান হতে পারে, এ সব তথ্য ওই গ্রুপে শেয়ার করা হতো।

    দীপকের বেআইনি কারবার বন্ধ করতে এসে মেখলিগঞ্জের বিএলএলআরও সুজন রায় আক্রান্ত হয়েছিলেন নেতার দলবলের হাতে। মেখলিগঞ্জ ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের আর এক আধিকারিক প্রশান্ত মণ্ডলও এই দলের হাতে আক্রান্ত হন। সেই সময়ে ভূমি আধিকারিকদের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন রানিরহাটের বাসিন্দা যামিনী রায়। অভিযোগ, তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে বস্তায় ভরে দীপকের গাড়িতে তুলে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ভূমি দপ্তরের এক কর্মীকেও জলে ফেলে দিয়েছিলেন দীপক। দপ্তরের কর্মীদের মারধরের পাশাপাশি তাঁদের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। মেখলিগঞ্জ থানায় এ নিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হলেও লাভ হয়নি।

    দীপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বৈধ খাদান থেকে সরকারি রয়‍্যালটি দিয়ে বালি বা পাথর উত্তোলন করতে গেলেও বিভিন্ন সময়ে বাধা সৃষ্টি করা হতো। স্থানীয় মানুষকে উস্কে দিয়ে বিক্ষোভ, আন্দোলন বা ব্যারিকেড তৈরির মতো পরিস্থিতি তৈরি করত দীপকের দলবল। পরে সেই সমস্যা মিটিয়ে দেওয়ার নামে প্রতিটি ডাম্পার থেকে অর্থ আদায় করা হতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ময়নাগুড়ির কাঠ মিলের মালিক বলেন, 'দুই বছর আগে সরকারি নিয়ম মেনে ১৬ লক্ষ টাকা দিয়ে জলঢাকা নদীতে একটি বালি খাদান নিয়েছিলাম। দীপক আমার খাদানে আসা গাড়িগুলিকে ফিরিয়ে দিতেন। আমার দু'টি গাড়ি ভাঙচুর করেছিলেন। বাধ্য হয়ে বালি খাদানের কাজ ছেড়ে দিই, পুরো টাকাই জলে গিয়েছে।'

    রানিরহাট মোড় থেকে চ্যাংড়াবান্ধা যাওয়ার রাস্তায় একটা রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন দীপক। কর্পোরেট স্টাইলে সেখানে নিজস্ব চেম্বার করেন। ভোটের ফল প্রকাশের পরে সেই রেস্তোরাঁ বন্ধ। এলাকায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে দাপুটে তৃণমূল নেতার বিপুল সম্পত্তির খতিয়ান। বালির অবৈধ ব্যবসার দৌলতে তিনি গাড়ি, বাড়ি, রেস্তোরাঁর মালিক হয়েছেন। ময়নাগুড়ি পুরসভার আট নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভ্রান্ত এলাকা বিবেকানন্দ পল্লিতে কোটি টাকা দিয়ে ৪৫ ডেসিমেল জমি কেনেন দীপক। এ ছাড়াও নামে-বেনামে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে তাঁর। সোমবার তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পরে বাড়ির পরিস্থিতি এখন থমথমে। ধৃতের কাকা যোগেন রায় বলেন, 'দীপক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। যেহেতু ও তৃণমূল করত, তাই রাজ্যে পালাবদলের পরে নতুন সরকার গ্রেপ্তার করেছে।' দীপকের সঙ্গে তাঁর দুই শাগরেদ তপন অধিকারী এবং চন্দন অধিকারীকেও গ্রেপ্তার করেছে ময়নাগুড়ি থানা। তাঁদের বিরুদ্ধে পাঁচটি তোলাবাজির মামলা ও মারধরের অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ মামলায় দীপক পুলিশের খাতায় পলাতক ছিলেন। পরে আদালত থেকে জামিন নেন। পুলিশ সূত্রে খবর, দীপকের মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে চক্রের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)