• গরমে ভিড় এড়িয়ে উত্তরবঙ্গের অফবিট এই ১২টি ‘হিডেন জেম’-এ ছুটি কাটানোর সেরা ঠিকানা
    আজ তক | ০৬ জুন ২০২৬
  • দক্ষিণ থেকে উত্তর, তীব্র গরমে একেবারে হাঁসফাঁস অবস্থা গোটা বাংলার। কলকাতা থেকে কোচবিহার, সর্বত্রই চড়চড় করে বাড়ছে পারদ। তবে স্বস্তির খবর একটাই, স্কুল-কলেজে গরমের ছুটি পড়ে গিয়েছে। এই মরশুমে চাতক পাখির মতো একটু শান্তির খোঁজ পেতে পাহাড় ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু চেনা দার্জিলিং, কালিম্পং কিংবা গ্যাংটকের সেই চেনা ভিড়ে কি আর মন ভরে? তাই এবার চেনা ছক ভেঙে ব্যাগ-পত্তর গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন উত্তরবঙ্গের কিছু অনাবিষ্কৃত স্বর্গে। খরচ প্রায় একই, কিন্তু মন ভালো করা এই ১২টি অফবিট ডেস্টিনেশনে গেলে আপনার আর সমতলে ফিরতে ইচ্ছে করবে না।

    ১. পাবং
    কালিম্পং থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে কার্শিয়ঙের এক নির্জন পাহাড়ি গ্রাম হলো পাবং। চেনা পর্যটন মানচিত্রের বাইরে থাকা এই গ্রামটি এখনও অনেকের কাছেই অচেনা। চারদিকে সবুজ চা-বাগান, পাইন আর ওক গাছের সারি। হোমস্টের বারান্দায় বসে দূরে বরফঢাকা হিমালয়ের শৃঙ্গ আর রাঙা সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে জুড়িয়ে যায় মন। এখান থেকে নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কও ঘুরে নেওয়া যায়। ২-৩ দিনের ছুটির জন্য পাবং এক আদর্শ ঠিকানা।

    ২. বাগোড়া
    কার্শিয়াং সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত বাগোড়া পৌঁছাতে কার্শিয়াং শহর থেকে গাড়িতে সময় লাগে মাত্র আধ ঘণ্টা। এই জায়গার আসল সম্পদ হলো এর অসামান্য নির্জনতা। বড় হোটেলের ভিড় এখানে নেই, স্থানীয়দের আন্তরিক আতিথেয়তা আর গুটিকয়েক হোমস্টেই এর ইউএসপি (USP)। এখানকার বিমানবাহিনীর ভিউ পয়েন্ট থেকে অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। কাছেই রয়েছে চিমনি, ডাওহিল ও ফরেস্ট মিউজিয়াম। পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে এখানে, তাই পাখিপ্রেমীদের জন্য বাগোড়া এক স্বর্গরাজ্য।

    ৩. মিসনতার
    মেঘ আর পাহাড়ের লুকোচুরি খেলা দেখতে চাইলে চলে আসুন মিসনতারে। হাতেগোনা কয়েকটি নেপালি পরিবারের বাস এই গ্রামে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সিনিয়লচু, পান্ডিম ও সিমভো শৃঙ্গের পাশাপাশি নাথুলা এবং জেলেপা পাসও স্পষ্ট দেখা যায়। অর্কিড, প্রিমুলা ও রোডোডেনড্রনের চাদরে মোড়া এই গ্রামটি পাখিপ্রেমীদের স্বর্গ। এখানকার বারোমাসি খরস্রোতা নদীতে মাছ দেখার পাশাপাশি মাছ ধরার আনন্দও উপভোগ করা যায়। শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) থেকে এর দূরত্ব ৮৫ কিলোমিটার।

    ৪. মঝৌল
    এক টুকরো সিকিমের স্বাদ যদি উত্তরবঙ্গেই পেতে চান, তবে মঝৌল আপনার জন্য সেরা স্পট। পাহাড় আর পাহাড়ি নদীর এমন যুগলবন্দী খুব কম জায়গায় মেলে। এখান থেকে সিকিমের ঋষিখোলার দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটার। মঝৌলকে বেস ক্যাম্প বানিয়ে অনায়াসে ঘুরে নেওয়া যায় সিকিমের সিল্ক রুট। শিলিগুড়ি বা এনজেপি থেকে গ্যাংটকগামী গাড়িতে চড়ে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই অফবিট গ্রামে।

    ৫. ফিকালেগাঁও
    কালিম্পং শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সবুজ পাহাড়ের কোলে এক লুকিয়ে থাকা রত্ন হলো ফিকালেগাঁও। অনেকেই একে কালিম্পং-এর অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্য বলেন। যাঁরা হোমস্টের ঘরে বসেই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে একেবারে চোখের সামনে ফ্রেমবন্দী করতে চান, তাঁদের জন্য এটি নিখুঁত ডেস্টিনেশন। শান্ত পরিবেশ, স্থানীয়দের সরল জীবনযাত্রা এবং অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ পলকেই আপনার মন ভালো করে দেবে।

    ৬. মিমবস্তি
    দার্জিলিংয়ের কোলাহল থেকে দূরে সম্পূর্ণ ‘ভার্জিন’ বা কুমারী এক পাহাড়ি গ্রাম হলো মিমবস্তি। শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব মাত্র ৭৫ কিলোমিটার। সুখিয়াপোখরির কাছে অবস্থিত এই গ্রামটি ঘুম থেকে ১৩.৫ কিমি এবং দার্জিলিং শহর থেকে ২০ কিমি দূরে। ঘন জঙ্গলের বুক চিরে সুখিয়াপোখরি হয়ে এখানে পৌঁছানো যায়। চা-বাগানের মাঝে হাঁটা আর কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখার পাশাপাশি এখানকার মূল আকর্ষণ হলো ১৯২০ সালের একটি ঐতিহ্যবাহী বাংলো ও গ্রামীণ ধাঁচের হোমস্টে।

    ৭. বিদ্যাং
    কালিম্পং লাভা রোড ধরে এগিয়ে রেলি সেতুর ডানদিকের জঙ্গলঘেরা রোমাঞ্চকর রাস্তা ধরে নামলেই দেখা মিলবে বিদ্যাং-এর। কালিম্পং শহর থেকে ১৫ কিমি দূরের এই উপত্যকাটি বয়ে চলেছে শান্ত রেলি নদীর তীরে। ঘন জঙ্গল, বিচিত্র উদ্ভিদ ও প্রাণীতে ঠাসা বিদ্যাং কোনও গতানুগতিক ট্যুরিস্ট স্পট নয়, বরং এখানে নদীর তীরে অলস সময় কাটানোই মূল আকর্ষণ।

    ৮. দাওয়াইপানি
    দার্জিলিং থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে, টাইগার হিলের ঠিক বিপরীতে ৬,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই দাওয়াইপানি গ্রাম। ঘন হিমালয়ান জঙ্গলে ঘেরা এই গ্রামটি ট্র্যাকার, হাইকার, ফটোগ্রাফার এবং পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এক গুপ্তধন। এখানে এমন কিছু বিরল প্রজাতির পাখি দেখা যায় যা অন্য কোথাও মেলা ভার। কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি ছুটির আমেজ পেতে দার্জিলিং যাওয়ার পথে এখানে একটা দিন কাটাতেই পারেন।

    ৯. রঙ্গীত মাজুয়া
    সিঙ্গালিলা বনাঞ্চলে ঘেরা উত্তরবঙ্গের আরও এক হিডেন জেম হলো রঙ্গীত মাজুয়া। দূষণমুক্ত পরিবেশ আর অচিরাচরিত উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের আঁতুড়ঘর এই ছবির মতো সুন্দর পাহাড়ি গ্রামটি। যাঁরা একাকীত্ব ও গভীর শান্তি পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই জায়গা স্বর্গসম। সারাদিন হরেক রকমের প্রজাপতির নাচ আর পাখিদের মিষ্টি কলকাকলিতে কীভাবে যে দিন কেটে যাবে, টেরই পাবেন না।

    ১০. তিনচুলে
    দার্জিলিং থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত তিনচুলে। একসময়ের প্রত্যন্ত এই গ্রামটি এখন স্বনির্ভর পরিবেশ-বান্ধব বা ইকো-ট্যুরিজম ভিলেজে পরিণত হয়েছে। চারপাশে তিনটে উঁচু পাহাড়ের চূড়া দূর থেকে দেখতে উনুন বা চুলার মতো লাগে বলেই এর নাম তিনচুলে। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্যানোরামিক ভিউ, তিনচুলে মনেস্ট্রি, ভিউ পয়েন্ট এবং তিস্তা নদীর রূপ এককথায় চোখ জুড়ানো।

    ১১. সিটং
    ৪০০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত আলপাইন পাইন বনে ঘেরা লেপচাদের গ্রাম সিটং, যা উত্তরবঙ্গের ‘কমলালেবুর গ্রাম’ নামে পরিচিত। এখানকার জিভে জল আনা কমলালেবুর বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী রূপ পর্যটকদের চুম্বকের মতো টানে। সিটং-এ বসে গির্জার কাছের ভিউ পয়েন্ট থেকে সবুজ উপত্যকা দেখার পাশাপাশি মাত্র একদিনের ট্রিপে দিলারাম, কার্শিয়াং, লাটপাঞ্চার, মুংপু এবং মহানন্দা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘুরে আসা যায়। এখানকার আবহাওয়া সারা বছরই মনোরম থাকে।

    ১২. বিজনবাড়ি
    দার্জিলিং থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এক রহস্যময় ও সুন্দর উপত্যকা হলো বিজনবাড়ি। পাইন ও কনিফার গাছের ঘন জঙ্গল আর শান্ত গ্রাম্য জীবনযাত্রাই এর মূল আকর্ষণ। এখানে পাহাড় আর নদীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। এখানকার উদাসীন রঙ্গীত নদীর ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। তাহলে আর দেরি কেন? গরমের ছুটি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বেছে নিন আপনার পছন্দের ঠিকানা।
     

     
  • Link to this news (আজ তক)