রহস্যের অন্তরালে নারীর প্রতিরোধের এক গল্প ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’
এই সময় | ০৬ জুন ২০২৬
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছবি মানেই সাধারণত সম্পর্ক, পরিবার আর আবেগের গল্প। তবে ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’-এ সেই পরিচিত পরিসর ছেড়ে তাঁরা পা রেখেছেন রহস্য ও মনস্তাত্ত্বিক নাটকের জগতে। একটি পুরোনো জমিদারবাড়ি, এক অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং তার সূত্র ধরে উন্মোচিত হতে থাকা বহু অন্ধকার সত্য— এই সব কিছুকে সঙ্গে নিয়ে এগোয় ছবির কাহিনি।
ছবির অন্যতম বড় শক্তি তার পরিবেশ নির্মাণ। ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়ির প্রতিটি কোণ যেন লুকিয়ে রাখে কোনও না কোনও গোপন ইতিহাস। অন্ধকার করিডর, নিস্তব্ধ ঘর, চাপা উত্তেজনা এবং অস্বস্তির আবহ দর্শককে প্রথম থেকেই গল্পের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। চিত্রগ্রহণ ও শিল্প নির্দেশনার কাজে সেই আবহ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এক প্রভাবশালী জমিদার, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে রয়েছে একাধিক বিতর্ক ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন। তাঁর তৃতীয় বিয়ের রাতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। তার পরেই তদন্তের সূত্রপাত। একে-একে সামনে আসে বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা অন্যায়, শোষণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের কাহিনি।
রহস্যের মোড়কে ছবিটি আসলে সমাজে নারীর অবস্থান এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে। নারীর ইচ্ছা, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিসত্তাকে কী ভাবে বারবার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে, সেই বাস্তবতাই ছবির অন্তর্লীন সুর। তবে এই বক্তব্য কখনও সরাসরি ভাষণে পরিণত হয় না। বরং চরিত্রদের অভিজ্ঞতা এবং ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই তা দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে ছবির প্রধান আকর্ষণ সোহিনী সেনগুপ্ত। ফুলপিসি চরিত্রে তিনি একদিকে যেমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনই প্রয়োজন মতো এনেছেন উষ্ণতা এবং রসবোধ। তাঁর উপস্থিতি ছবির গতি ধরে রাখে। রাইমা সেন নিজের চরিত্রের জটিলতা ও মানসিক টানাপড়েনকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অর্জুন চক্রবর্তীও তাঁর চরিত্রে যথেষ্ট সাবলীল। অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, ঋষভ বসু-সহ অন্যান্য শিল্পীরাও নিজেদের ভূমিকা সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন। আর শ্যামপ্তি মুদলির কথা আলাদা করে উল্লেখ করতেই হবে।
ছবির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক তার প্রতীকী নির্মাণ। ‘এডওয়ার্ড’ শুধুমাত্র একটি নাম নয়, বরং ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়ের এক প্রতিরূপ হিসেবে উঠে আসে। অন্য দিকে ফুলপিসি হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, যুক্তি এবং সাহসের মুখ। এই দ্বন্দ্বই ছবির মূল চালিকাশক্তি।
ছবির শেষভাগ শুধুমাত্র রহস্যের সমাধানে আটকে থাকে না। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদ এবং দীর্ঘদিনের নীরবতার অবসানের কথাও বলে। সেই কারণেই ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ শুধুমাত্র একটি রহস্যকাহিনি নয়, এটি নারীর প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদা এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হয়ে থাকে।
নন্দিতা-শিবপ্রসাদের পরিচিত আবেগঘন জগতের বাইরে এই নতুন পরীক্ষা নিঃসন্দেহে সাহসী। কিছু খামতি থাকলেও ছবিটি রহস্য, সামাজিক বক্তব্য এবং শক্তিশালী অভিনয়ের সমন্বয়ে সমসাময়িক বাংলা ছবির ভিড়ে নিজস্ব জায়গা তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছে। জিনিয়া সেন আর সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখারও প্রশংসা করতেই হয়।