কতটা পথ পেরোলে তবে ট্রেন পাওয়া যায়?
নদিয়ার করিমপুরের লোকজনকে প্রশ্নটা করলে উত্তর আসবে, ‘প্রায় ৭৭ কিলোমিটার।’ আর জলঙ্গির লোকজন বলবেন, ‘প্রায় ১০০ কিলোমিটার গো!’ কারণ, ওই দু’টি এলাকা থেকে ‘কাছাকাছি’ রেল স্টেশন, কৃষ্ণনগরের দূরত্ব তেমনটাই। বহরমপুর কিংবা পলাশি থেকেও ট্রেন ধরা যায়। তবে ঝক্কি, সময়, দূরত্ব ও দুর্ভোগ আরও বাড়ে বই কমে না।
নদিয়া–মুর্শিদাবাদের ওই দুই জনপদ রেলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সেই ১৯০৫ থেকে। তারপরে পদ্মা, মাথাভাঙা দিয়ে ঢের জল গড়িয়েছে। রেলের স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছে। শনিবার নবান্নে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, রেল–মানচিত্রের বাইরে থাকা বহু এলাকায় এ বার রেলপথ হবে। যা আগের রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে করা সম্ভব হয়নি। সেই তালিকায় নাম রয়েছে করিমপুর ও জলঙ্গিরও। তারপরে ফের আশায় বুক বাঁধছে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ওই দুই জনপদ।
করিমপুরের বিধায়ক বিজেপির সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ বলছেন, ‘এ বার ভোটের আগে রেলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। ৪ মে ফল ঘোষণার পর থেকে রেল নিয়ে নিজের মতো করে একটা হোমওয়ার্কও করেছিলাম। সেই সব কাগজপত্র মুখ্যমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রীকে দিয়েছিলাম। এক মাসের মাথায় রেলমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী রেলপথের ঘোষণা করলেন। বিজেপি সরকার সব সময়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’
গত একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে রেলের দাবিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের একাধিক দপ্তরে চিঠিচাপাটি, আন্দোলন, বিক্ষোভ, জনমত গড়ে তোলা, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার, হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ তৈরি, নানা জায়গায় ছোট ছোট বৈঠক— করিমপুর ও জলঙ্গির সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বাদ যায়নি প্রায় কিছুই।
রেলের তরফেও কখনও সমীক্ষা হয়েছে, বাজেটে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। রাজনীতির কারবারিদের পক্ষ থেকে বছরের পর বছর ধরে মিলেছে প্রতিশ্রুতি। অভিযোগ, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে, কেন্দ্র ও রাজ্যে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার হওয়ায় অনেকেই এ দিন বলেছেন, ‘কথায় আছে, বৃথা আশা মরতে মরতেও মরে না। আশা করি, এ বার আমাদের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।’
করিমপুর ও জলঙ্গির স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এই প্রান্তিক এলাকা থেকে কৃষ্ণনগরে যেতে গেলে বাস ছাড়া গতি নেই। পথ–দুর্ঘটনা প্রায় রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। জখমের সংখ্যাও কম নয়। কৃষ্ণনগর বা করিমপুর থেকে শেষ বাস ছেড়ে দিলে বিপাকে পড়েন বহু মানুষ। এ বার রেলপথ হলে দল–মত নির্বিশেষে মুখ্যমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রীকে প্রাণভরে শুভেচ্ছা, আশীর্বাদ ও ধন্যবাদ জানাবেন এই এলাকার সকলে।
হোগলবেড়িয়া থানার কুচাইডাঙা তকিপুরের বাসিন্দা ভাস্কর মণ্ডল কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। তিনি কলকাতা থেকে করিমপুর যাতায়াতের পথে বাসযাত্রার ভোগান্তি নিয়ে নিয়মিত ভিডিয়ো পোস্ট করেন ফেসবুকে। মাস কয়েক আগে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘উই ওয়ান্ট রেলওয়ে’ নামে একটি গ্রুপও তৈরি করেছেন। বহু মানুষ এখন সেই গ্রুপের সদস্য।
ভাস্কর বলছেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরেও আমরা ছোট ছোট বৈঠক করছি। এই এলাকার জীবন ও জীবিকার জন্য রেলপথ খুব জরুরি। রেলপথ না থাকার কারণে বহু মানুষ মারা গিয়েছেন। রেলের দাবিতে আন্দোলনকারীদেরও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। আমরা সকলেই চাইছি, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা দ্রুত বাস্তবে রূপায়িত হোক। ট্রেনের হুইসলে ঘুম ভাঙুক আমাদের।’