এই সময়: বাগডোগড়া থেকে নয়াদিল্লি। বিমানে সরাসরি যেতে মেরেকেটে লাগে আড়াই ঘণ্টা। আর ট্রেনে? চিন্তা করতে গেলে গায়ে জ্বর আসে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের। আগামী দিনে হয়তো শিলিগুড়ি থেকে নয়াদিল্লি পৌঁছনো যাবে মাত্র ছ’ঘণ্টায়!
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে শনিবার রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ঘোষণা করলেন, আগামী দিনে শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি নয়াদিল্লি পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালু হবে। সেই ট্রেন চালু হলে মাত্র ছ’ঘণ্টাতেই শিলিগুড়ি থেকে দেশের রাজধানী শহরে পৌঁছনো যাবে। এ দিন রাজ্যে রেলের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে নবান্নে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে রেলমন্ত্রীর বিস্তারিত আলোচনা হয়। তার পরে সাংবাদিক বৈঠকে দু’জনেই জানান, এত দিন পূর্বতন সরকারের অসহযোগিতার জন্য রেলের বহু প্রকল্প বাস্তবায়িত করা যায়নি। রেলমন্ত্রী জানান, তাঁর মন্ত্রক ইতিমধ্যে বঙ্গে এক লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে। বাংলার জন্য রেকর্ড ১৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে শুধু বর্তমান আর্থিক বছরের জন্য। শুভেন্দু জানান, রাজ্যের যে সব এলাকা এখনও রেল মানচিত্রের বাইরে রয়েছে, আগামী দিনে সেই নদিয়ার করিমপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও গড়াবে রেলের চাকা। ফলে রেল পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও বাংলায় ডাবল ইঞ্জিন ছুটতে শুরু করবে বলে আশাবাদী অর্থনীতিবিদদের একটা বড় অংশ।
একমাস আগে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। তার পরে প্রথম বার কলকাতায় এলেন রেলমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরে তিনি চিংড়িঘাটায় আটকে থাকা মেট্রোরেলের কাজ খতিয়ে দেখেন। তিনি জানিয়েছেন, পূর্বতন সরকারের অসহযোগিতার জন্য রাজ্যবাসী মোদী সরকারের আমলে রেলের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু এ বার রেলকে সব রকম সহযোগিতা করছে রাজ্য। শুভেন্দু জানান, রাজ্যবাসী শিগগিরই ডাবল ইঞ্জিন সরকারের ফলের স্বাদ পাবেন। জেলাশাসক থেকে শুরু করে অন্য অফিসারদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রেলকে গোটা রাজ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাজ করতে হবে। রেল জমি কিনতে টাকা দেয়। যেখানে দরকার, জমি আমরা কিনে রেলকে দেবো। রেল যেমন সহযোগিতা চাইবে, করতে হবে। ক্যালেন্ডার তৈরি করুন, কবে, কোন জায়গায় রেলের জমি দিতে পারবেন!’
শনিবার সকালে প্রথমে কলকাতা মেট্রোয় সফর করেন অশ্বিনী। তার পরে অটোরিকশাতেও চড়েন। নবান্নে রাজ্য সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল জানান, চিংড়িঘাটায় আটকে থাকা মেট্রো প্রকল্পের কাজ ৪৮ ঘণ্টায় শেষ হয়েছে। পূর্বতন রাজ্য সরকারের অনুমোদন মিলছিল না বলে ৭০টি প্রকল্প পড়েছিল। এর পরেই শুভেন্দু বলেন, ‘রেলের সঙ্গে আগের সরকারের যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব ছিল। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক তারা এত খারাপ জায়গায় নিয়ে যায় যে, সেই কারণে বাংলার মানুষকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। মোদীজি যে উন্নয়ন করেছেন, তা থেকে বাংলার ১১ কোটি মানুষ বঞ্চিত।’ মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘রেল সেক্টরে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি কাজ হবে। অশ্বিনীজি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। টাকা প্রস্তুত। দ্রুত কাজ হবে।’
আগামী দিনে রাজ্যে রেলের কোন কোন প্রকল্প হতে চলেছে, েসগুলির হিসেব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, দিল্লি থেকে লখনউ, বারাণসী হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত চলবে বুলেট ট্রেন। রাজধানী থেকে শিলিগুড়িতে পৌঁছনো যাবে মাত্র ছ’ঘণ্টায়। এ ছাড়াও রাজ্যে ১০২টি নতুন অমৃত ভারত স্টেশনের আধুনিকীকরণ হবে। ৫৩৮টি উড়ালপুল এবং আন্ডারপাস তৈরি হবে। তৃণমূল সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘আগের সরকার রেল মন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলেনি। রেলমন্ত্রী অনেক বার চিঠি দিয়েছেন। ওরা জবাব পর্যন্ত দেয়নি।’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঝুলে থাকা রেল প্রকল্পে এনওসি দিলে, জমি দিলে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের সুযোগ রেলের রয়েছে।’
রেলমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই শুভেন্দুকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আপনি দেশকে যে ভাবে বাঁচিয়েছেন, বাংলাকে বাঁচিয়েছেন, সেই জন্য অভিনন্দন। এ বার রেলকর্মীরা কাজ করার সুযোগ পাবেন।’ তার পরেই তৃণমূলকে কটাক্ষ করে তিনি জানান, পূর্বতন রাজ্য সরকার প্রকল্পে অনুমোদন দিত না। চিংড়িঘাটার কাজ আটকাতে তারা কোর্টেও গিয়েছিল। হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তা মানেনি। তাঁর কথায়, ‘কলকাতাবাসী যাতে মেট্রোর সুবিধা না পান, তাই আগের সরকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল। সংসদে আমি ওদের বলেছিলাম বিকাশ-বিরোধী।’ কেন্দ্রের পূর্বতন ইউপিএ সরকারের দিকে আঙুল তুলে বৈষ্ণব বলেন, ‘২০০৯-২০১৪ সালে মেট্রো এবং বিভিন্ন রেল প্রকল্পে বাংলা পেয়েছিল ৪,৩৮০ কোটি টাকা। মোদীজি বাংলাকে ভালোবাসেন। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রাজ্যে রেলের প্রকল্পের জন্য তিনি দিয়েছেন ১৪,২০৫ কোটি টাকা।’ তাঁর আশ্বাস, ‘আগামী দিনে অনেক ভালো কাজ হবে। রাজ্যের প্রতি মোদীজির যে ভালোবাসা রয়েছে, তার উদাহরণ কলকাতা মেট্রো। ১৯৭২ সালে কাজ শুরু হয়। ৪২ বছরে ২৮ কিলোমিটার পথ ছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে ৪৫ কিলোমিটার মেট্রো তৈরি করেছেন মোদীজি।’ রেলমন্ত্রী জানান, আগামী চার-পাঁচ বছরে কলকাতা মেট্রো নিউ জেনারেশনের ৬০টি রেক পাবে।